প্রতিনিধি ১৩ অগাস্ট ২০২৫ , ১২:৩৪ পিএম প্রিন্ট সংস্করণ
খাবারের স্বাদ আমাদের জীবনের একটি বড় আনন্দের উৎস। কিন্তু যখন হঠাৎ করে সেই স্বাদ হারিয়ে যায়, তখন তা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, উদ্বেগেরও কারণ হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘এজিউসিয়া’ বা স্বাদহীনতা। এটি কোনো সাধারণ শারীরিক অসুস্থতা থেকে শুরু করে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। সঠিক সময়ে এর কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসা করা গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাদ আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব। তবে কিছু ক্ষেত্রে স্বাদ হারানো স্থায়ী হতে পারে।
চিকিৎসকরা স্বাদ হারানোর বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কিছু কারণ নিচে দেওয়া হলো:
১. কোভিড-১৯: স্বাদ হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ
সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণকে স্বাদ ও গন্ধ হারানোর একটি বড় কারণ হিসেবে ধরা হয়। এই ভাইরাস মুখের ভেতরের টেস্ট বার্ড এবং নাকের ঘ্রাণগ্রাহী কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৭ শতাংশ কোভিড-আক্রান্ত মানুষ স্বাদ হারান এবং তাদের অধিকাংশই প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে আবার স্বাদ ফিরে পান।
২. সাধারণ সর্দি ও অন্যান্য ভাইরাল সংক্রমণ
ফ্লু বা সাধারণ সর্দির মতো শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও সাময়িকভাবে স্বাদ নষ্ট করে দিতে পারে। এ সময় নাক বন্ধ থাকায় খাবারের গন্ধ বোঝা যায় না, যার ফলে স্বাদের অনুভূতি কমে যায়। তবে সংক্রমণ সেরে গেলে স্বাদ সাধারণত স্বাভাবিক হয়ে আসে।
৩. অ্যালার্জি ও সাইনাস ইনফেকশন
অ্যালার্জি বা সাইনাসের প্রদাহের কারণে নাকের ভেতরে ফ্লুইড জমা হয়, যা ঘ্রাণ ও স্বাদকে প্রভাবিত করে। দীর্ঘস্থায়ী সাইনুসাইটিসও স্বাদকে প্রভাবিত করতে পারে। এ অবস্থায় নিয়মিত নাসারন্ধ্র পরিষ্কার রাখা এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি।
৪. নাকের পলিপ
নাকের ভেতরে নরম ও ব্যথাহীন টিউমারের মতো দেখতে এই পলিপগুলো সাধারণত বারবার সংক্রমণ বা অ্যালার্জির কারণে হতে পারে। পলিপের কারণে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি কমে যায়। এর চিকিৎসার জন্য ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
৫. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু ওষুধ যেমন— উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, অ্যালার্জি এবং মানসিক রোগের ওষুধ মুখ শুকনো করে দেয় বা স্বাদকোষের কার্যকারিতা নষ্ট করে দিতে পারে। কোনো ওষুধ সেবনের পর এমন সমস্যা হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
৬. ক্যানসারের চিকিৎসা
কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশন থেরাপির মতো ক্যানসারের চিকিৎসা স্বাদের অনুভূতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে চিকিৎসা শেষ হলে সাধারণত স্বাদ ফিরে আসে।
৭. পুষ্টির অভাব
দেহে জিঙ্কের অভাব হলে স্বাদের গ্রন্থিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, যা স্বাদহীনতার অন্যতম একটি কারণ। জিঙ্ক পাওয়া যায় মাংস, ডিম, বাদাম ও কিছু শাকসবজিতে। পুষ্টির ঘাটতি সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৮. দাঁত ও মুখের সমস্যা
দাঁতের ব্যথা, মাড়ির রোগ বা মুখের ভেতরের কোনো সংক্রমণও স্বাদকে প্রভাবিত করতে পারে। ভালো মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এই সমস্যা অনেকাংশে কমে যায়।
৯. বার্ধক্য ও স্নায়বিক রোগ
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাদের অনুভূতি কিছুটা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। এছাড়া আলঝাইমার ও অন্যান্য ডিমেনশিয়ার মতো স্নায়বিক রোগও স্বাদ হারানোর কারণ হতে পারে।
১০. মাথায় আঘাত ও রাসায়নিকের প্রভাব
মাথায় আঘাত লাগলে তা মস্তিষ্কের স্বাদকেন্দ্রকে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া কিছু রাসায়নিক, যেমন— কীটনাশকের সংস্পর্শে এলে স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি কমে যেতে পারে। ধূমপান ও মদ্যপানও এই সমস্যার কারণ হতে পারে।
যদি স্বাদহীনতা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা হঠাৎ করে অন্য কোনো উপসর্গ, যেমন— জ্বর, সর্দি বা শ্বাসকষ্টের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তিনি কারণ নির্ণয়ের জন্য শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে বলতে পারেন।
স্বাদহীনতা দূর করার জন্য কিছু উপায় মেনে চলতে পারেন:
স্বাদহীনতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক সমস্যা, যা সঠিক যত্ন ও চিকিৎসার মাধ্যমে দূর করা যায়। তবে এটি কোনো গুরুতর সমস্যার লক্ষণও হতে পারে, তাই অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া খুবই জরুরি। সুস্থ জীবনযাপন ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস আপনার স্বাদের আনন্দকে দীর্ঘমেয়াদি করতে সাহায্য করবে।