প্রতিনিধি ২৯ অগাস্ট ২০২৫ , ১০:০৩ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত অবরোধ ও হামলার কারণে দুর্ভিক্ষ এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা। উপত্যকাটিতে অপুষ্টি ও ক্ষুধায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এর মধ্যে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপুষ্টি ও ক্ষুধায় আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে দুটি শিশুও রয়েছে। একই সঙ্গে, প্রায় এক লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা বারবার সতর্ক করে আসছে যে, গাজায় খাদ্য ও মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ না থাকায় এই সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাজায় যে দুর্ভিক্ষ চলছে তা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট। এটি একটি পরিকল্পিত বিপর্যয় যা সংঘাতের পরিণতিতে সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক উপপ্রধান জয়েস মুসুইয়া বলেছেন, উত্তর-মধ্য গাজার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই দুর্ভিক্ষ দক্ষিণ গাজার দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিসেও ছড়িয়ে পড়বে। বর্তমানে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অনাহারে আছে এবং সেপ্টেম্বরের শেষে এই সংখ্যা ৬ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। কার্যত গাজার কোনো মানুষই ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচতে পারছে না।
পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। মুসুইয়া জানান, প্রায় এক লাখ ৩২ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে ৪৩ হাজারেরও বেশি শিশু জীবন-সংকটে পড়বে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা ৩১৩ জনে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে ১১৯ জন শিশু। এই চিত্র গাজার মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতা তুলে ধরে।
এদিকে, জাতিসংঘ সমর্থিত খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) গাজার দুর্ভিক্ষ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনকে ইসরায়েল ত্রুটিপূর্ণ ও অপেশাদার বলে অভিহিত করে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। তবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকি ১৪ সদস্য দেশ আইপিসি’র প্রতিবেদনকে সমর্থন করেছে। তাদের যৌথ বিবৃতিতে অবিলম্বে দুর্ভিক্ষ বন্ধ এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে।
শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রধান ইঙ্গার অ্যাশিং নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে বিশ্বনেতাদের নীরবতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গাজার শিশুদের পরিকল্পিতভাবে অনাহারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষুধাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গাজার ক্লিনিকগুলোতে কঙ্কালসার শিশুদের ছবি তুলে ধরে তিনি বলেন, তারা এতটাই দুর্বল যে ব্যথায় কাঁদতেও পারছে না। তিনি আরও বলেন, আগে শিশুরা তাদের আঁকায় শান্তি, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত, কিন্তু এখন তারা শুধু খাবারের ছবি আঁকে। অনেক শিশু এমনকি মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করছে। অ্যাশিং একটি শিশুর লেখা তুলে ধরে বলেন, “ইশ, আমি যদি আমার মায়ের কাছে স্বর্গে থাকতে পারতাম। সেখানে ভালোবাসা আছে, খাবার আছে, পানি আছে।” এই উক্তিটি গাজার শিশুদের করুণ বাস্তবতাকে আরও মর্মান্তিকভাবে প্রকাশ করে।
এই মানবিক সংকট শুধু খাদ্য বা চিকিৎসার অভাব নয়, এটি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। যে শিশুরা একসময় খেলাধুলা আর স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত ছিল, আজ তারা ক্ষুধা আর মৃত্যুর ভয়ে কাতর। গাজায় চলমান এই পরিস্থিতি বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিচ্ছে, এবং দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।