প্রতিনিধি ২৩ অগাস্ট ২০২৫ , ৯:১৯ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি দল নির্বাচনের আগেই সনদটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বলছে, সনদের কিছু অংশ আইন ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে সংবিধান সংশোধনীগুলো নতুন সংসদের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া উচিত।
এনসিপির কঠোর অবস্থান
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সম্প্রতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে তাদের মতামত জমা দিয়েছে। তাদের মূল দাবি, কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করে আগামী নির্বাচনের আগেই ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর সব প্রস্তাব ও সুপারিশ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এনসিপি সমন্বিত খসড়ায় থাকা এই ধারার বিরোধিতা করেছে যেখানে বলা হয়েছে, “যে সকল প্রস্তাব/সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য বলে বিবেচিত হবে, সেগুলো কোনো প্রকার কালক্ষেপণ না করেই…সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করবে।” এনসিপি-র মতে, এই ধারাটি অস্পষ্ট এবং এতে সনদের আংশিক বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা তারা কোনোভাবেই মানতে রাজি নয়।
এনসিপি আরও দাবি করেছে যে, গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সনদের সমস্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতাকে গণ-অভ্যুত্থান এবং এর নিজস্ব ঘোষণাপত্রের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করে, এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নকে পরবর্তী সংসদের কাছে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে।
বিএনপির ভিন্নমত
এনসিপি-র মতো একই ধরনের কঠোর অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলোও। তবে, বিএনপি এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হলে একটি খারাপ নজির তৈরি হবে। তার মতে, যেসব সংস্কার আইন ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে করা সম্ভব, সেগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বাস্তবায়ন করতে পারে। কিন্তু সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কারগুলো ভবিষ্যতের নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে করা উচিত।
জুলাই জাতীয় সনদ ও রাজনৈতিক ঐকমত্য
দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছয়টি কমিশন গঠন করেছিল, যাদের ৮৪টি প্রস্তাব নিয়েই তৈরি হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। গত ২৯ জুলাই দলগুলোকে এই সনদের একটি খসড়া দেওয়া হয়, যার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ‘সমন্বিত খসড়া’। এই খসড়াটি গত ১৬ আগস্ট দলগুলোর কাছে পাঠানো হয় মতামত দেওয়ার জন্য। প্রাথমিক খসড়ায় বলা হয়েছিল, নির্বাচনের পর গঠিত সরকার দুই বছরের মধ্যে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করবে, কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিসহ অন্যান্য দলের আপত্তির মুখে এই ধারা পরিবর্তন করা হয়।
বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য দলের মতামত
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ঐকমত্য কমিশন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিচ্ছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ মোট ২৩টি দল এই সমন্বিত খসড়ার উপর তাদের মতামত জমা দিয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য এবং গণ অধিকার পরিষদের মতো কিছু দল এখনো তাদের মতামত জমা দেয়নি।
ঐকমত্য কমিশনের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার জানান, মতামত দেওয়ার শেষ সময় ছিল ২২ আগস্ট। যে সকল দল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মতামত জমা দিতে পারেনি, ধরে নেওয়া হবে তাদের কোনো মতামত নেই।
রাজনৈতিক মহলের মতে, জুলাই সনদ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে এই মতবিরোধ আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে। এটি শুধু সংস্কার প্রক্রিয়াকেই বিলম্বিত করবে না, বরং দেশের রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।