প্রতিনিধি ২৮ অগাস্ট ২০২৫ , ৯:২৩ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া মতামত পর্যালোচনা করে তারা জুলাই সনদের সমন্বিত খসড়া চূড়ান্ত করছে। এটি চূড়ান্ত হওয়ার পর আগামী সপ্তাহে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু করতে চায় কমিশন।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। প্রথম ধাপে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ। এই কমিশনগুলোর দেওয়া ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই তৈরি হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ।
সনদের প্রাথমিক খসড়া গত ২৯ জুলাই ৩০টি দলকে দেওয়া হয়েছিল। এরপর তাদের মতামতের ভিত্তিতে ১৬ আগস্ট একটি ‘সমন্বিত খসড়া’ তৈরি করে কমিশন। ২৯টি রাজনৈতিক দল এই খসড়ার ওপর তাদের মতামত দিয়েছে।
এই সনদে তিনটি ভাগ রয়েছে: পটভূমি, ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব এবং আট দফা অঙ্গীকারনামা। সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও, সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ও পদ্ধতি নিয়ে মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, সনদকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া এবং আদালতে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন না তোলার বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এমন বিধানের পক্ষে মত দিয়েছে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়েও দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। বিএনপি মনে করে, আইন ও বিধি-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে কার্যকর করতে পারে। তবে সংবিধান-সংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলো নতুন জাতীয় সংসদে পাস করা উচিত।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী চাইছে গণভোট অথবা রাষ্ট্রপতির প্রোক্লেমেশনের (ঘোষণা) মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হোক। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণপরিষদ গঠন করে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা একই সঙ্গে গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।
এই মতবিরোধের সমাধান খুঁজে বের করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নিজেদের কার্যালয়ে নিয়মিত বৈঠক করছে। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া মতামতগুলো গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সনদের অঙ্গীকারনামা অংশে কিছু ভাষাগত পরিবর্তন আনা হতে পারে, যাতে সব দলের মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত হয়।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। সবার মতামতকে সমন্বিত করে এবং সনদের আইনি ও সাংবিধানিক দিক বিবেচনা করে খসড়ায় কিছু সংশোধনী আনা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার কোন পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করতে পারে, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে অধ্যাপক আলী রীয়াজ ছাড়াও কমিশনের অন্যান্য সদস্য যেমন বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার সহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, ঐকমত্য কমিশন এখন একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সব রাজনৈতিক দলের ভিন্ন ভিন্ন দাবি ও পরামর্শগুলোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই সনদ চূড়ান্ত হওয়ার পরই জানা যাবে, সংস্কারের পথ কতটা মসৃণ হবে।