জাতীয়

খুলনার চরে সবুজ বনের ছায়া: কেওড়া ফলের অপরূপ গল্প

  প্রতিনিধি ২৭ অগাস্ট ২০২৫ , ৮:৫৭ এএম প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনার চরে সবুজ বনের ছায়া: কেওড়া ফলের অপরূপ গল্প

খুলনার উপকূলীয় অঞ্চল, যেখানে শাকবাড়িয়া ও কয়রা নদী বয়ে গেছে সুন্দরবনের পাশ দিয়ে, সেখানে প্রকৃতির এক অসাধারণ রূপ ফুটে উঠেছে। নদীর চরে এখন সারি সারি কেওড়া গাছের সবুজ বন, যা দেখে মনে হয় সুন্দরবনের এক ছায়া নেমে এসেছে এপারে। এই কেওড়া গাছগুলো নিজে থেকেই জন্মেছে, সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা ফলের বীজ থেকে। সময়ের সাথে সাথে এই চরের জমিতে গড়ে উঠেছে এক নিজস্ব বন, যা স্থানীয় মানুষের জীবনে এনেছে নতুন এক সম্ভাবনা।

২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই কেওড়া বনের বিস্তার ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাসান জানান, সুন্দরবনের জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা কেওড়া ফল চরে আটকে নতুন গাছ তৈরি হয়েছে। এখন পুরো চরেই কেওড়ার বন দেখা যায়। ষাটোর্ধ্ব রাজিয়া বেগম জানান, এই গাছের ফল শুধু স্বাদে অতুলনীয় নয়, এটি স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যেরও অংশ। কাঁচা, রান্না করে, কিংবা আচার-চাটনি বানিয়ে এটি খাওয়া হয়, যার টক-মিষ্টি স্বাদ সকলের খুব প্রিয়।

এই বনের সাথে জড়িয়ে আছে জেলেদের জীবনের নানা গল্প। জেলে আবদুল হাকিম ও আমিরুল ইসলাম জানান, এই কেওড়া ফল শুধু মানুষই নয়, বনের হরিণ ও বানরেরও প্রিয় খাদ্য। বানর গাছ থেকে ফল ও পাতা ছিঁড়ে ফেলে, আর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা হরিণ সেই পাতা খায়। যেন তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বোঝাপড়া রয়েছে। তারা আরও বলেন, এই কেওড়া ফল সেদ্ধ করে বড়শিতে গেঁথে মাছ ধরলে বড় আকারের পাঙ্গাশ পর্যন্ত ধরা পড়ে। সুন্দরবনের মধুর একটি বড় অংশও আসে এই কেওড়ার ফুল থেকে। শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্ত বনে কেওড়ার ফল পাওয়া যায়।

কেওড়া ফল কেবল স্বাদের জন্যই বিখ্যাত নয়, এর রয়েছে বিশেষ স্বাস্থ্যগুণও। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ফল ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, ডায়রিয়া, এমনকি ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকর। এতে থাকা উপাদান খাদ্য ও প্রসাধনী শিল্পেও ব্যবহৃত হয়। সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্যসচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এই ফল commercially উৎপাদন শুরু হলে উপকূলের মানুষের জন্য নতুন আয়ের পথ খুলে যাবে।

তবে এই কেওড়া বনের বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সুন্দরবনের ভেতরের গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা আইনত দণ্ডনীয়। তবে নদীর চরে বা লোকালয়ে যদি বাণিজ্যিকভাবে কেওড়া চাষ করা যায়, তাহলে তা পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সুফল বয়ে আনবে। এই কেড়া বন শুধু প্রকৃতির এক অপরূপ দান নয়, এটি খুলনার উপকূলীয় মানুষের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার প্রতীক।