প্রতিনিধি ২৭ অগাস্ট ২০২৫ , ৯:০৮ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের দামামা বেজে উঠেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভয়হীন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এই নির্বাচনে। একসময় যে ক্যাম্পাসে ‘গেস্টরুম সংস্কৃতি’ আর রাজনৈতিক চাপ ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, আজ সেখানে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। শিক্ষার্থীদের মাঝে ফিরে এসেছে উৎসবের আমেজ, আর প্রার্থীরা ব্যস্ত তাদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের মন জয় করতে।
সদ্য শুরু হওয়া প্রচারণার প্রথম দিনেই ক্যাম্পাসজুড়ে দেখা গেছে ব্যানার, ফেস্টুন আর প্ল্যাকার্ডের সমারোহ। বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে ভোট চাইছেন, তুলে ধরছেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহার। এই উৎসবমুখর পরিবেশ দেখে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা। অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়া ইসলাম বলেন, “একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শুধু রাজনীতি নিয়ে পড়ে না থেকে যারা সত্যিকার অর্থে শিক্ষা ও গবেষণার মান বাড়াতে কাজ করবে, তাদেরই বেছে নেব।”
বদলে যাওয়া ক্যাম্পাসের এই চিত্র অনেকের কাছেই নতুন। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জিহাদ আলী, যিনি মাত্র দু’মাস আগে ক্যাম্পাসে এসেছেন, তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। তিনি বলেন, “বড় ভাইদের কাছে শুনেছি, আগে ক্যাম্পাসের অবস্থা কেমন ছিল! সেই পরিবেশ যাতে আর ফিরে না আসে।” শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশা করছেন, এই ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ‘রাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয়’ পরিচয়ের খোলস ছেড়ে একটি শিক্ষা ও গবেষণার সুস্থ পরিবেশে পরিণত হবে।
ডাকসু নির্বাচনে এবার বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন। বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের প্রচারণা শুরু করেছে। এই প্যানেলের জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু বলেন, “আমরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গেই আছি এবং আমাদের প্রচারণা পূর্ণভাবে চালিয়ে যাচ্ছি।” তবে তারা জালিয়াতির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল ‘প্রতিশ্রুতি নয়, পরিবর্তনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ’ স্লোগানে প্রচার শুরু করেছে। ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যান্য প্যানেল, যেমন ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’, ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’, ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ এবং ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ও তাদের নিজেদের মতো করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি প্যানেলই শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়েছে।
এদিকে, নির্বাচনের প্রথম দিনেই ব্যানার-ফেস্টুন ছেঁড়ার ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ এর ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেছে। নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে তারা।
আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচন। এবারের ডাকসুতে ২৮টি পদের বিপরীতে মোট ৪৭১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ৬২ জন ছাত্রী। প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, ডাকসুর ভিপি পদে ৪৫ জন, জিএস পদে ১৯ জন এবং এজিএস পদে ২৫ জন প্রার্থী লড়বেন।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে থাকবে তিন স্তরের নিরাপত্তা। বিএনসিসি ও প্রক্টোরিয়াল টিমের পাশাপাশি পুলিশ এবং প্রয়োজনে সেনাবাহিনী ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে কাজ করবে। নির্বাচনের সময় আবাসিক হলে কোনো বহিরাগত থাকতে পারবে না এবং মেট্রো রেলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বন্ধ থাকবে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পরিবর্তন শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এই নির্বাচন কেবল নতুন নেতৃত্বই দেবে না, বরং শিক্ষা ও গবেষণার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে ক্যাম্পাসে নতুন প্রাণসঞ্চার করবে।