আন্তর্জাতিক

গাজায় নীরব গণহত্যা: ইসরায়েলের অবরোধে অনাহারে মৃত্যুর মুখে লাখো শিশু

  প্রতিনিধি ২৮ অগাস্ট ২০২৫ , ১:৫৩ পিএম প্রিন্ট সংস্করণ

গাজায় নীরব গণহত্যা: ইসরায়েলের অবরোধে অনাহারে মৃত্যুর মুখে লাখো শিশু

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত অবরোধ ও হামলার কারণে দুর্ভিক্ষ এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। উপত্যকাটিতে খাদ্য ও মানবিক সহায়তার অপ্রতুলতার কারণে অপুষ্টি ও ক্ষুধায় মানুষের মৃত্যু বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ তথ্যানুসারে, আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুটি শিশু। এর ফলে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অনাহারে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৩ জনে, যাদের মধ্যে ১১৯ জন শিশু। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি এক নীরব গণহত্যার করুণ চিত্র।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে বলেছে যে, গাজায় চলমান এই দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, বরং এটি একটি মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট একটি মানবিক সংকট। ইসরায়েলের কঠোর অবরোধের কারণে জীবন রক্ষাকারী ত্রাণসামগ্রী সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না, ফলে শিশুদের না খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা ক্রমবর্ধমান হারে ঘটছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক উপপ্রধান জয়েস মুসুইয়া জানান, উত্তর-মধ্য গাজার বিশেষ করে গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ নিশ্চিত হয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি দক্ষিণের দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিসেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ অনাহার ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই সংখ্যা দ্রুত ৬ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গাজায় কার্যত কোনো মানুষই ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচতে পারছেন না।

এই মানবিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক লাখ বত্রিশ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে তেতাল্লিশ হাজারেরও বেশি শিশুর জীবন আগামী মাসগুলোতে চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রধান ইঙ্গার অ্যাশিং গাজার শিশুদের করুণ অবস্থা তুলে ধরে বলেন, ক্লিনিকগুলো এখন কঙ্কালসার শিশুদের ভিড়ে ভর্তি। তারা এতটাই দুর্বল যে ব্যথায় কাঁদতেও পারে না। অনেক শিশু ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই শিশুরা এখন আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে না, বরং তাদের আঁকা ছবিতে কেবল খাবারের ছবি দেখা যায়। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, অনেক শিশু এখন মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করছে। একটি শিশুর লেখা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “ইশ, আমি যদি আমার মায়ের কাছে স্বর্গে থাকতে পারতাম। সেখানে ভালোবাসা আছে, খাবার আছে, পানি আছে।”

অন্যদিকে, ইসরায়েল এই পরিস্থিতিকে অস্বীকার করছে। ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক এডেন বার টাল জাতিসংঘ সমর্থিত আইপিসি’র দুর্ভিক্ষ সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে ত্রুটিপূর্ণ ও অপেশাদার বলে মন্তব্য করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদের বাকি ১৪টি সদস্য দেশ আইপিসি’র প্রতিবেদনকে সমর্থন জানিয়েছে এবং গাজায় দুর্ভিক্ষ অবিলম্বে অবসানের আহ্বান জানিয়েছে। তারা একইসঙ্গে অবিলম্বে, নিঃশর্ত এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতিরও আহ্বান জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এই নীরবতাকে নিন্দা করে ইঙ্গার অ্যাশিং বলেন, গাজায় দুর্ভিক্ষ এসে গেছে এবং এটি ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট। যুদ্ধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে শিশুদের পরিকল্পিতভাবে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বশক্তির নীরবতা এবং ইসরায়েলের অব্যাহত অবরোধের ফলে গাজার পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও খারাপ হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হচ্ছে।