প্রতিনিধি ২৮ অগাস্ট ২০২৫ , ১০:৪৮ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
গাজা উপত্যকায় জীবনের প্রতিটি দিনই এখন এক নতুন যুদ্ধের নাম। সেখানে সাধারণ মানুষ যেমন জীবন-মৃত্যুর সীমারেখায় দাঁড়িয়ে, তেমনি সাংবাদিকরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছেন। তাঁবুতে বাস, বিদ্যুৎহীন জীবন আর অনিরাপত্তার মুখেও তারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরছেন গাজার নির্মম বাস্তবতাকে।
গাজার সাংবাদিকরা যে কী পরিমাণ প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যান, তা আমাদের কল্পনারও অতীত। সাংবাদিক আবদুল্লাহ মিকদাদ যেমনটি বলেছেন, ‘কখনো কল্পনাও করিনি যে আমাকে তাঁবুতে থাকতে হবে, কাজ করতে হবে। পানি ও বাথরুমের মতো মৌলিক চাহিদা থেকে আমাকে বঞ্চিত থাকতে হবে।’ এই তাঁবুগুলো গ্রীষ্মে গ্রিনহাউসের মতো গরম আর শীতে রেফ্রিজারেটরের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। তবুও তাদের উপায় নেই, কারণ বিদ্যুৎ ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেটের জন্য তাদের হাসপাতালের কাছাকাছি থাকতে হয়, যেখানে জেনারেটরের মাধ্যমে কিছুটা হলেও চার্জিং সুবিধা পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো গাজার খবর সংগ্রহের জন্য সেখানকার স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপরই মূলত নির্ভর করে। কারণ, ইসরায়েল বিদেশী গণমাধ্যমগুলোকে সরাসরি খবর সংগ্রহ করতে দেয় না। এমনকি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সাংবাদিকদের সুরক্ষা পাওয়ার কথা থাকলেও, গাজায় তা প্রায়শই উপেক্ষিত। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুধু গাজাতেই ১৮৯ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা গত তিন বছরে বিশ্বব্যাপী নিহত সাংবাদিকের মোট সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সিন্ডিকেটের সেক্রেটারি আহেদ ফারওয়ানা বিবিসিকে বলেছেন, ‘সাংবাদিক হিসেবে মনে হয় আমরা ক্রমাগত ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছি।’ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও, তারা আল জাজিরার সংবাদদাতা আনস আল-শরিফকে তার তাঁবুতে হত্যার দায় স্বীকার করেছে, যদিও তার বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী’ কার্যকলাপের মিথ্যা অভিযোগ তুলেছিল। এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে গাজার সাংবাদিকরা শুধু খবর সংগ্রহ করছেন না, তারা নিজেরাই এখন খবরের অংশ।
গাজার সাংবাদিকরা কেবল বুলেট আর বোমার মুখে নয়, তারা দুর্ভিক্ষের শিকারও। ইউক্রেন, রাশিয়া, আমেরিকা, কিংবা জাপানের মতো দেশ থেকে এসে একজন সাংবাদিক প্রতিবেদন করতে পারেন। কিন্তু গাজার সাংবাদিকরা সেই অঞ্চলেরই মানুষ। তারা একইসঙ্গে খবরের অংশ এবং তার বাহক। নিজেদের পরিবারকে বাঁচানোর পাশাপাশি তাদের খবর সংগ্রহ করতে হয়। ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিস্ট আহমেদ জালাল যেমনটি বলেছেন, ‘একটা কর্মদিবসে আপনি যা খেতে পান তা হলো এক কাপ কফির সাথে ছোলা মিশিয়ে, অথবা চিনি ছাড়া এক গ্লাস চা।’ দিনের পর দিন ক্ষুধার্ত থেকেও তারা কাজ চালিয়ে যান। তার নিজের ছেলেই চিকিৎসার অভাবে ভুগছে, কিন্তু তাও তিনি সাংবাদিকতার কাজ থামাননি। তিনি মনে করেন, এই ব্যক্তিগত যন্ত্রণা তার প্রতিবেদনকে আরও সত্যের সঙ্গে উপস্থাপন করতে সাহায্য করে।
গাজার সাংবাদিকরা এতটাই মানসিক চাপে আছেন যে তারা নিজেদের অনুভূতিও প্রকাশ করতে পারেন না। সাংবাদিক ঘাদা আল-কুর্দ বলেন, ‘এই যুদ্ধের সময়, আমরা আমাদের আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি।’ তিনি তার দুই মেয়ের জন্য ভয় আর ভাই ও তার পরিবারের জন্য শোক চাপা দিয়ে কাজ করে চলেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই যুদ্ধের ক্ষত সারতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
আন্তর্জাতিক মহল থেকে ইসরায়েলের কাছে গাজায় স্বাধীন বিদেশী সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকারের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, গাজার সাংবাদিকরা এখনো একাকী, মৃত্যু ও দুর্ভোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন। তাদের পেশাদারিত্ব, সাহস আর আত্মত্যাগ পৃথিবীর বুকে গাজার আসল চিত্র তুলে ধরছে, যা হয়তো কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম একা করতে পারত না। তারা শুধু সাংবাদিক নন, তারা মানবতার দূত।