প্রতিনিধি ২৮ অগাস্ট ২০২৫ , ৯:৫৭ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতীয় সিনেমা ও সিরিজের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত। এই পুরোনো বিষয়কেই নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেছে নেটফ্লিক্সের স্পাই থ্রিলার সিরিজ ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’। তবে এটি কেবল দুটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক গুপ্তচরের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনের জটিল দ্বন্দ্ব। ছয় পর্বের এই সিরিজটি সত্তরের দশকের পটভূমিতে নির্মিত, যখন ভারতের সদ্য গঠিত গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (RAW) পাকিস্তানের প্রায় দুই দশকের পুরোনো এবং শক্তিশালী ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (ISI)-এর সঙ্গে টক্কর দিতে শুরু করে।
সিরিজটির মূল চরিত্র বিষ্ণু, একজন ভারতীয় গুপ্তচর, যার লক্ষ্য ইসলামাবাদে পাকিস্তানের গোপন পারমাণবিক প্রকল্প বানচাল করা। তার এই মিশনে সবচেয়ে বড় বাধা আইএসআই প্রধান মুর্তজা মালিক। এক দিকে স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম, অন্য দিকে পাকিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুপ্তচর নেটওয়ার্ক সামলানো—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বিষ্ণুর জীবন আবর্তিত হয়। অন্যদিকে, আইএসআই প্রধান মুর্তজা মালিককেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, তার দেশের জন্য পারমাণবিক শক্তি অর্জন করা জরুরি, এবং এর জন্য তিনি যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। গল্পটি রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য নিয়ে এগিয়ে যায়, যেখানে কোনো পক্ষই পুরোপুরি ভালো বা খারাপ নয়।
এই সিরিজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সানি হিন্দুজার অভিনয়। মুর্তজা মালিক চরিত্রে তিনি একজন খলনায়ককে ভিন্ন আলোয় তুলে ধরেছেন। তিনি একই সঙ্গে নির্মম এবং মানবিক। দেশের প্রতি তার অন্ধ আনুগত্য তাকে নিজের ভেতরের মানবিক সত্তাকে ঘৃণা করতে বাধ্য করে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তিনিই এই গল্পের প্রকৃত নায়ক। অন্যদিকে, প্রতীক গান্ধীর বিষ্ণু চরিত্রটি শুরুতে বেশ সম্ভাবনাময় মনে হলেও, শেষ দিকে দেশপ্রেমী নায়ক হয়ে ওঠার মোড় ঘোরানোটা কিছুটা কৃত্রিম লেগেছে। তবে, সিরিজের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাকে দুর্বল করে দেখানো হয়নি। বরং, তাদের অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা অধিকাংশ ভারতীয় নির্মাণে দেখা যায় না।
সিরিজটির দুর্বলতাও আছে। নির্মাতার দ্বিধা স্পষ্ট—তিনি একদিকে গুপ্তচরদের দ্বৈত জীবন এবং যন্ত্রণা দেখাতে চেয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা ধরে রাখতে পারেননি। ইন্দিরা গান্ধী, জুলফিকার আলী ভুট্টো, হেনরি কিসিঞ্জার এবং মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি সিরিজটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে, যদিও বিদেশি চরিত্রগুলোর সংলাপে ভারতীয় টান কিছুটা কানে লেগেছে। তা ছাড়া, তিলোত্তমা সোমের মতো একজন শক্তিশালী অভিনেত্রী তার দুর্বলভাবে লেখা চরিত্রের কারণে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরতে পারেননি।
‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’ গড়পড়তা ভারতীয় স্পাই থ্রিলারের তুলনায় অনেক উজ্জ্বল। এটি গুপ্তচরদের ধূসর এবং জটিল জগতকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, যেখানে কোনো চূড়ান্ত বিজয়ী নেই। সিরিজটিতে পাকিস্তানি নারী সাংবাদিক ফাতিমা খানের (কৃতিকা কামরা) চরিত্রটিও প্রশংসার দাবিদার। তার চরিত্রটি আরও বিস্তৃত হলে গল্পে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারত।
তবে, সিরিজটি শেষ পর্যন্ত ক্লিশে দেশাত্মবোধের একটি আবেশ দিয়ে শেষ হয়েছে, যা গল্পের গভীরতা নষ্ট করেছে। সম্ভবত দর্শকদের আকর্ষণ ধরে রাখার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও, যারা গুপ্তচরদের ভিন্ন চোখে দেখতে চান এবং প্রচলিত ভারত-পাকিস্তান গল্পের বাইরে কিছু দেখতে আগ্রহী, তাদের জন্য ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’ একটি ভালো দেখার মতো সিরিজ হতে পারে।