প্রতিনিধি ২৯ অগাস্ট ২০২৫ , ১০:৫৮ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে আগামী রোববার ‘মার্চ ফর অস্ট্রেলিয়া’ নামের একটি অভিবাসনবিরোধী সমাবেশকে ঘিরে দেশটির বহু সাংস্কৃতিক সমাজে তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে ‘অস্ট্রেলীয় ঐতিহ্য’ রক্ষার কথা বললেও, আয়োজকদের ফাঁস হওয়া অডিও কথোপকথনে তাদের আসল উদ্দেশ্য উন্মোচিত হয়েছে, যা তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফাঁস হওয়া অডিওতে আয়োজকদের একজন, যিনি নিজেকে ‘বেক ফ্রিডম’ নামে পরিচয় দেন, তাকে বলতে শোনা যায় যে শ্বেতাঙ্গ অস্ট্রেলিয়ার কথা বললে ‘নাৎসি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয় থাকে। তাই কৌশলগতভাবে এই শব্দটির পরিবর্তে ‘অস্ট্রেলীয় ঐতিহ্য’ ব্যবহার করা উচিত। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘অস্ট্রেলীয় ঐতিহ্য’ মানেই শ্বেতাঙ্গ ও ইউরোপীয় ঐতিহ্য। এই মন্তব্য বহু সংস্কৃতির মিলনভূমি হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলিয়ার মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
এই অডিও প্রকাশ হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক এবং বহু সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যান আলি যৌথ বিবৃতিতে এই সমাবেশের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলেন, যারা অস্ট্রেলিয়ার সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করতে এবং সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়, তাদের জন্য এ দেশে কোনো জায়গা নেই। মন্ত্রীরা আরও বলেন, আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে যারা আছেন, তারা এই ধরনের সমাবেশের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াচ্ছেন। তাদের মতে, এমন একটি সমাবেশের চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার চেতনার পরিপন্থী আর কিছু হতে পারে না।
সমাবেশের প্রচারপত্রেও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানো হয়েছে। বিশেষভাবে ভারতীয় সম্প্রদায়কে নিশানা করে লেখা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে যত ভারতীয় অস্ট্রেলিয়ায় এসেছেন, তা বিগত ১০০ বছরে আসা গ্রিক ও ইতালীয়দের সংখ্যার চেয়েও বেশি। এই ধরনের বক্তব্য অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে, বিশেষ করে ভারতীয়দের মধ্যে, বর্ণবাদী হামলার আশঙ্কা তৈরি করেছে। অভিবাসী সম্প্রদায়ের নেতারাও এই ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
এই বিতর্কিত সমাবেশের অনুমতি দেওয়ায় নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও পুলিশ জানিয়েছে, তারা সমাবেশের দিন কঠোর নজরদারি রাখবে এবং যেকোনো ধরনের বেআইনি বা বিপজ্জনক আচরণ কঠোরভাবে দমন করবে, তবু একটি বর্ণবাদী সমাবেশের অনুমতি দেওয়ায় দেশটির বহুসাংস্কৃতিক সমাজের নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই সমাবেশ কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রচেষ্টা নয়, বরং অস্ট্রেলিয়ার বহুত্ববাদী পরিচয়ের ওপর একটি সরাসরি আঘাত।
অস্ট্রেলিয়া বরাবরই অভিবাসীদের স্বাগত জানিয়ে এসেছে, এবং এই বৈচিত্র্যই দেশটির শক্তি ও সমৃদ্ধির উৎস। ‘মার্চ ফর অস্ট্রেলিয়া’র মতো সমাবেশগুলো সেই মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তবে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের নিন্দা এই বার্তা দিচ্ছে যে, বিভেদকামী শক্তিগুলো অস্ট্রেলিয়ার বুকে সহজে জায়গা করে নিতে পারবে না।