রাজনীতি

বিএনপির উপদেষ্টা ফজলুর রহমানের পদ স্থগিত: শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব সন্তোষজনক নয়

  প্রতিনিধি ২৭ অগাস্ট ২০২৫ , ৯:০৩ এএম প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপির উপদেষ্টা ফজলুর রহমানের পদ স্থগিত: শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব সন্তোষজনক নয়

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ফজলুর রহমানের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সকল পদ তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। গত রোববার ফজলুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যার লিখিত জবাব তিনি মঙ্গলবার জমা দেন। কিন্তু তার সেই জবাব দলের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি। যদিও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অবদানকে সম্মান জানানো হয়েছে, তবুও দলের শৃঙ্খলা রক্ষার্থে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

দলীয় সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে, ফজলুর রহমান এখন থেকে টক শো বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো বক্তব্য দেওয়ার সময় যেন দেশের মর্যাদা, দলের নীতিমালা এবং জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগে, সেদিকে সর্বদা সচেতন থাকবেন।

গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য ও টেলিভিশন টক শোতে কথা বলে ফজলুর রহমান ব্যাপক আলোচনায় আসেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তার অবস্থান অনেকের প্রশংসা পেলেও, কিছু বক্তব্য বিতর্কও তৈরি করেছে।

কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং ফজলুর রহমানের জবাব

জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগে গত রোববার ফজলুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিএনপি। নোটিশ পাওয়ার পর তিনি লিখিত জবাবের জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেন। দল তাকে আরও ২৪ ঘণ্টা সময় দেয়।

মঙ্গলবার জমা দেওয়া তার লিখিত জবাবে ফজলুর রহমান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন:

১. গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন: কোটাবিরোধী আন্দোলন যখন শুরু হয়েছিল, তখন তিনি ইউটিউবের মাধ্যমে ছাত্রদেরকে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার মতে, ছাত্রদের নির্দলীয় আন্দোলনকে তিনি রাজনৈতিক দাবিতে রূপান্তর করতে উৎসাহিত করেন।

২. জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণ: তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি যুক্ত ছিলেন, যা তার দল এবং দেশের মানুষ জানে।

৩. ২৮শে অক্টোবর ও কর্মীদের উজ্জীবিত করা: ২০২৩ সালের ২৮শে অক্টোবরের মহাসমাবেশ ভেঙে দেওয়ার পর যখন হাজার হাজার নেতাকর্মী জেলে ছিলেন, তখন তিনি প্রতিদিন অনলাইন ও টেলিভিশন টক শোতে অংশ নিয়ে তাদের উজ্জীবিত করেছিলেন।

৪. জামায়াত-শিবির এবং জুলাই আন্দোলন: ৫ আগস্টের সাফল্যের পর যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা সারজিস আলম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে ‘জামায়াত-শিবিরই ছিল জুলাই আন্দোলনের মূল ভ্যানগার্ড’, তখন তিনি আশঙ্কিত হন। তিনি মনে করেন, জামায়াত-শিবির আন্দোলনের বিজয় নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করেছে। তিনি বারবার প্রতিবাদ করে বলেছেন যে, বিএনপি ১৫ বছর ধরে আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং ফসল ফলিয়েছে, কিন্তু ছাত্র আন্দোলনের নেতারা সেই ফসল কেটে নিয়ে গেছে।

৫. ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং নতুন ষড়যন্ত্র: জামায়াত-শিবির যখন ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে বিভিন্ন বক্তব্য দিতে শুরু করে এবং ১৯৪৭ ও ২০২৪ সালকে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে আখ্যায়িত করে, তখন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি জামায়াত-শিবিরকে ‘কালো শক্তি’ এবং এনসিপিকে তাদের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে দেশের প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় দখলের অভিযোগ আনেন।

৬. বিএনপি ও তারেক রহমানের প্রতি আনুগত্য: ফজলুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, তার দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমানের প্রতি তার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রয়েছে এবং এই অপশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলাকে তিনি নিজের পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করেন। তিনি আরও বলেন যে, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যখন ‘গাছের ডালে কাউয়া’ স্লোগান দিয়ে রাজনৈতিকভাবে অপমান করা হচ্ছিল, তখন তিনিই প্রথম এর বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দেন।

৭. ভুল হলে দুঃখ প্রকাশ: তিনি স্বীকার করেন যে, তার শত শত বক্তব্যের মধ্যে কিছু ভুল থাকতে পারে, কারণ তিনি মানুষ। যদি প্রমাণিত হয় যে তিনি কোনো ভুল বক্তব্য দিয়েছেন, তবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করবেন।

সবশেষে, ফজলুর রহমান তার দলের প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং আশা করেন যে তিনি সুবিচার পাবেন। তার এই জবাবের পরই দল তার বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।