প্রতিনিধি ২৯ অগাস্ট ২০২৫ , ১০:১৩ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
পশ্চিম ইউরোপের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন অস্থিরতা বিরাজ করছে, আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স। সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক জনমত জরিপে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—ফ্রান্সের অধিকাংশ নাগরিক নতুন সংসদীয় ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চান। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে দুটি জরিপ অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশ ফরাসি নাগরিক বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন। এই পরিস্থিতিতে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অনিশ্চয়তায়।
সরকারের ওপর অনাস্থা ও পতনের শঙ্কা
বর্তমানে ফ্রান্সে একটি সংখ্যালঘু সরকার ক্ষমতায় আছে, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বেয়ারু। কিন্তু এই সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী বেয়ারু ২০২৬ সালের বাজেট পরিকল্পনার ওপর ৮ সেপ্টেম্বর আস্থা ভোট নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণার পর থেকেই দেশটির শেয়ার ও বন্ড বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। প্রধান বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যেই সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা সরকারের পতনকে প্রায় নিশ্চিত করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের পতন হলে ম্যাক্রোঁ হয় নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন অথবা আগাম সংসদীয় নির্বাচন ডাকবেন। তবে বিরোধী নেতাদের একাংশ মনে করেন, এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ। যদিও ম্যাক্রোঁ আগাম নির্বাচন ও পদত্যাগের সম্ভাবনা উভয়ই উড়িয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ম্যাক্রোঁর পুনর্নির্বাচনের পর থেকেই ফ্রান্স সংখ্যালঘু মন্ত্রিসভা ও বিভক্ত সংসদের কারণে রাজনৈতিক অস্থিরতার শিকার।
জনগণের মনোভাব: পদত্যাগ ও আগাম নির্বাচন
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো ফরাসি জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে তুলে ধরেছে। ইলাবে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, ৬৭ শতাংশ নাগরিক মনে করেন, আস্থা ভোটে হেরে গেলে ম্যাক্রোঁর পদত্যাগ করা উচিত। আরেকটি জরিপ অনুসারে, ৫৬ থেকে ৬৯ শতাংশ মানুষ আগাম সংসদ নির্বাচন চান।
এদিকে, টোলুনা হ্যারিস ইন্টারেক্টিভ জরিপে দেখা গেছে, অতি-ডানপন্থী দল জাতীয় সমাবেশ (আরএন) সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেলেও, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ শতাংশ মানুষ আরএন-কে পরবর্তী সরকার পরিচালনার পক্ষে সমর্থন দিলেও, ৫৯ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ৩৮ শতাংশ নাগরিক চান, এমন একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হোক যিনি কোনো পেশাদার রাজনীতিবিদ নন। এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, ফরাসি জনগণ প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি একরকম আস্থা হারিয়েছেন।
অর্থনৈতিক সংকট ও বাজেট নিয়ে বিতর্ক
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি ফ্রান্সকে বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটেরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। গত বছর ফ্রান্সের জিডিপির ৫.৮ শতাংশ ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রধানমন্ত্রী বেয়ারু ৪৪ বিলিয়ন ইউরোর বাজেট সংকোচনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর অংশ হিসেবে সরকারি ছুটি বাতিল এবং সরকারি ব্যয় স্থগিত করার মতো কঠোর পদক্ষেপের কথা বলা হয়। কিন্তু বিরোধীরা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। বামপন্থী দলগুলো ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে, আর অতি-ডানপন্থীরা কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে কথা বলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ বা আগাম নির্বাচন—যেকোনো পরিস্থিতিতেই ফ্রান্স দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে এবং বাজেট পাস নিয়ে জটিলতা আরও বাড়বে। মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো তত কঠিন হয়ে উঠবে। দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ভোটারদের প্রভাবিত করতে বিভিন্ন ইস্যু সামনে আনবে।
ম্যাক্রোঁর ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি দেশকে আধুনিকীকরণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু একের পর এক বিক্ষোভ, কোভিড-১৯ মহামারি এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে তার ব্যয় সংকোচন নীতি বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর বামপন্থী দল ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো নতুন বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সব মিলিয়ে, ফ্রান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন এক বড় প্রশ্নের মুখে।