রাজনীতি

নির্বাচন কমিশনের অস্থিরতায় অনিশ্চয়তায় রাবি শিক্ষার্থীরা

  প্রতিনিধি ২৯ অগাস্ট ২০২৫ , ১০:৪১ এএম প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন কমিশনের অস্থিরতায় অনিশ্চয়তায় রাবি শিক্ষার্থীরা

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন ঘিরে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের কারণে এই নির্বাচন এখন অনিশ্চয়তার মুখে। এই অস্থিরতা একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তেমনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।

নির্বাচন কমিশনের এই বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পেছনে ছাত্র সংগঠনগুলোর ‘আবদার’ পূরণ করার চাপকে কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং নির্বাচনে আগ্রহী প্রার্থীরা। তাদের মতে, ছাত্র সংগঠনগুলোর বিভিন্ন দাবি-দাওয়া মেটাতে গিয়েই কমিশনকে বারবার নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হচ্ছে। এর ফলে নির্বাচনের প্রস্তুতি না থাকা একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠন লাভবান হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

 

বারবার সময় পরিবর্তন: সিদ্ধান্তহীনতার প্রতিফলন?

 

প্রথম দফায় তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশন একের পর এক পরিবর্তন এনেছে। প্রথম তফসিল অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট থেকে মনোনয়নপত্র বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু আগের দিন মধ্যরাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে হঠাৎ করে সেই কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এই সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং ছাত্রনেতারা একে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেন।

এরপর ২০ আগস্ট বিকেলে নির্বাচনের তারিখ (১৫ সেপ্টেম্বর) অপরিবর্তিত রেখে নতুন করে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এরপরও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের দাবির মুখে মনোনয়নপত্র বিতরণের সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়। এরই মাঝে ছাত্রদল নির্বাচন পেছানোর জন্য সময় চেয়ে প্রশাসনকে চাপ দিতে থাকে। তাদের এই দাবি এবং অন্যান্য সংগঠনের অনুরোধ মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন আবারও জরুরি বৈঠকে বসে।

একদিকে যখন ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মতো সংগঠনগুলো এই পরিবর্তনের প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই ২৮ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়। এই তারিখ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়, কারণ ওই দিনটি ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠী। সমালোচনার মুখে কমিশন আবারও জরুরি বৈঠকে বসে এবং ভোট গ্রহণের নতুন তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করে।

 

কার লাভ? কার ক্ষতি?

 

নির্বাচনের তারিখ বারবার পেছানোয় কোন প্যানেল বা দলের লাভ হয়েছে, সেই আলোচনা এখন ক্যাম্পাসে সবার মুখে মুখে। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এবং প্রার্থীর মতে, এই বিলম্বের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ছাত্রদল। নির্বাচন যখন ১৫ সেপ্টেম্বরকে লক্ষ্য করে এগোচ্ছিল, তখন বাম জোট, ছাত্রশিবির এবং স্বতন্ত্র প্যানেলগুলো প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু ছাত্রদলের তেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এই সময় পরিবর্তনের ফলে তারা তাদের প্যানেল গোছানো এবং প্রচার-প্রচারণার জন্য বাড়তি সময় পেয়েছে।

রাকসু নির্বাচনের স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী নোমান ইমতিয়াজ বলেন, “ছাত্রদল শুরু থেকেই নির্বাচন পেছানোর জন্য সময় চেয়ে আসছিল এবং প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করছিল। তাদের এই আবদার পূরণ করতেই নির্বাচন কমিশন বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।”

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সরদার জহুরুল ইসলাম বলেন, “আমরা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সময় চেয়েছিলাম। আমাদের কোনো দাবি প্রশাসন মেনে নেয়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি বিশেষ দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।”

এই পুরো পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীবের মন্তব্য জানার জন্য বারবার যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ছাত্র সংগঠনগুলোর সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এই পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এই সিদ্ধান্ত আর পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই।”

তবে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তহীনতা এবং বারবার তারিখ পরিবর্তনের কারণে রাকসু নির্বাচনের ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা শঙ্কিত যে, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে কি না।