শুল্ক-সংকটে নয়া দিল্লি: ইসরায়েলের দিকে কি ঝুঁকছে ভারত?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত-বিরোধী শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একদিকে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ভারত তার পুরনো ও নির্ভরযোগ্য মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার কৌশল নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আসন্ন ভারত সফরের ইঙ্গিত এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। অনেকেই এটিকে ‘সংকটকালে পুরোনো বন্ধুত্বের পুনর্জাগরণ’ হিসেবে দেখছেন।
ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ইতিহাসের নানা বাঁকে, বিশেষ করে কঠিন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল বারবার ভারতের পাশে থেকেছে। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যখন ভারতকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তখন ইসরায়েলই দ্রুত এগিয়ে আসে। সেই সময় ইসরায়েল থেকে পাওয়া প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং গোয়েন্দা সহায়তা ভারতের জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। একইভাবে পহেলগাঁও হামলার মতো বিভিন্ন কঠিন মুহূর্তে ইসরায়েল ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ, গোয়েন্দা সহায়তা, প্রযুক্তিগত ও কৃষি উন্নয়নে ইসরায়েলের সহযোগিতা ভারতকে বহুলাংশে সাহায্য করেছে।
আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ভারতের অর্থনীতি ও কূটনীতিতে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এই চাপের মুখে মোদি সরকার বিকল্প কৌশল হিসেবে ইসরায়েলের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদারের দিকে মনোযোগ বাড়াচ্ছে। তবে এই কৌশল শুধুমাত্র অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থেকে উদ্ভূত নয়। এর পেছনে রয়েছে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মতো গভীর কূটনৈতিক হিসাব। ইসরায়েল আধুনিক প্রযুক্তিতে বিশ্বে অগ্রগামী, বিশেষ করে সামরিক প্রযুক্তি এবং সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ভারতের এই বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিকে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ভারত আজ কেবল একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বহুমুখী বন্ধুত্বের সমীকরণে চলছে। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, পশ্চিম এশিয়ার অংশীদারিত্ব এবং ঐতিহাসিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের এক মিশ্রণ স্পষ্ট। এটি ভারতের কৌশলগত ধারাবাহিকতার একটি অংশ, যা যেকোনো সংকটে দ্রুত কার্যকর সমাধান খুঁজে পাওয়ার পরীক্ষিত উপায়।
ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক বা সামরিক নয়, এর সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। দুই দেশের নেতৃত্ব প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন, যা পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে সাহায্য করে। নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য ভারত সফরকে এই প্রেক্ষাপটে দেখা যেতে পারে। এটি শুধু দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে না, বরং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে সৃষ্ট বাণিজ্যিক চাপ ভারতকে তার কূটনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক জোরদার করা একটি বিচক্ষণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এটি ভারতের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সামরিক ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ভারতের এই কৌশলগত পদক্ষেপ ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ককেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে বলে আশা করা যায়।