প্রতিনিধি ১৩ অগাস্ট ২০২৫ , ১:০২ পিএম প্রিন্ট সংস্করণ
বান্দরবানের উঁচু পাহাড়ের কথা উঠলেই সবার মনে আসে ক্রিসতং এবং রুংরাং চূড়ার নাম। এই দুটি পাহাড় আলিকদম উপজেলার চিম্বুক রেঞ্জে অবস্থিত এবং ট্রেকারদের জন্য এক দারুণ চ্যালেঞ্জ ও অপার সৌন্দর্যের এক ঠিকানা। ক্রিসতং হচ্ছে চিম্বুক রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়া, যার উচ্চতা ২৯৮৯ ফুট। মারমা ভাষায় ‘ক্রিস’ অর্থ একধরনের পাখি এবং ‘তং’ অর্থ পাহাড়। অন্যদিকে, রুংরাংকে বলা হয় চিম্বুক রেঞ্জের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া, যার অর্থ ‘ধনেশ পাখি’। এক সময় এই চূড়াগুলোতে এই দুই ধরনের পাখির আনাগোনা থাকলেও, আজ তারা প্রায় বিলুপ্ত।
১০ জুলাই রাতে আমরা ১১ জন একটি দল নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা দেই এই স্বপ্নপূরণের উদ্দেশ্যে। আমাদের গন্তব্য ছিল কক্সবাজারগামী বাসে করে চকরিয়া। পথেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি, যা ট্রেকিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের মনে শঙ্কা তৈরি করে। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যেও আমরা ভোর ৬টায় চকরিয়া পৌঁছে যাই। সেখানে আমাদের সাথে যোগ দেন দলের দ্বাদশ সদস্য। এবার আমরা মোট ১২ জন, চান্দের গাড়িতে করে আলিকদম উপজেলার দিকে রওনা হই।
আলিকদম পৌঁছে স্থানীয় গাইড ফারুখ ভাইকে সাথে নিয়ে আমরা ইউএনও এবং থানা থেকে ট্রেকিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নেই। এরপর শুরু হয় আমাদের আসল যাত্রা। চান্দের গাড়িতে করে আমরা আলিকদম-থানচি সড়কের ২১ কিলো পয়েন্টে পৌঁছাই। পথের দুই পাশে পাহাড় আর মেঘের মন মুগ্ধকর দৃশ্য আমাদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। ২১ কিলো থেকে আমরা আমাদের প্রধান গন্তব্য খেমচং পাড়ার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করি। ট্রেকিংয়ের প্রথম অংশে পিচ ঢালা রাস্তা পার হওয়ার পর মূল পাহাড়ি পথে আমাদের অভিযান শুরু হয়।
হাঁটতে হাঁটে এক সময় আমরা নিজেদের মেঘের সমুদ্রে আবিষ্কার করি। ঘন সাদা কুয়াশার মতো মেঘ আমাদের চারপাশ ঘিরে ধরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির কারণে জোঁকের উপদ্রব বেড়ে যায় এবং রাস্তাগুলো পিচ্ছিল ও দুর্গম হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা নামার আগেই অন্ধকার নেমে আসে। পাড়ায় পৌঁছানোর জন্য দ্রুত হাঁটতে হয় আমাদের। একসময় পথ হারিয়ে আমরা কয়েকটি ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে যাই। অবশেষে রাত ৯টায় আমরা খেমচং পাড়ায় পৌঁছাই। কারবারির ঘরে আমাদের থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা হয়। সে রাতে সবাই গরম ভাতের সাথে মুরগির ঝোল দিয়ে ভরপেট খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি, কারণ পরদিন খুব ভোরেই আমাদের ক্রিসতং পাহাড়ের দিকে যাত্রা করতে হবে।
পরদিন ভোরে আমরা ৮ জন হালকা নাস্তা সেরে ক্রিসতংয়ের পথে রওনা দেই। ক্রিসতংয়ের ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এই জঙ্গলে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছায় না। মনে হয় যেন কোনো শীতের সকালে কুয়াশাচ্ছন্ন গভীর জঙ্গলে হাঁটছি। ছবি তোলা, আড্ডা দেওয়া, আর পাহাড়ের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আড়াই ঘণ্টা ট্রেকিংয়ের পর আমরা পৌঁছে যাই ক্রিসতংয়ের চূড়ায়। এতক্ষণের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায় চারপাশের অপরূপ দৃশ্য দেখে। এই চূড়া থেকে চারদিকের পাহাড় এবং মেঘের সৌন্দর্য দেখে সবাই অভিভূত হয়ে যাই।
দুপুরের পর আমরা পাড়ায় ফিরে আসি এবং খিচুড়ি ও ডিমের সুস্বাদু খাবার খেয়ে আবার ব্যাগ গুছিয়ে নেই। এবার আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মেনিয়াংপাড়া এবং পথে রুংরাং পাহাড় সামিট। বিদায়বেলায় খেমচং পাড়ার একটি শিশুর সাথে দেখা হয়। শিশুটির নাম ‘মিংসিয়াই’, যার মা তাকে অল্প বয়সেই রেখে চলে গেছেন। নিজের জীবনে মায়ের শূন্যতা অনুভব করা একজন হিসেবে তার প্রতি আমার এক বিশেষ টান অনুভূত হয়।
খেমচং পাড়া থেকে রুংরাংয়ের পথে হাঁটা শুরু করি। রুংরাংয়ের চূড়ায় পৌঁছে মনে হচ্ছিল যেন আমি কোনো স্বপ্নের জগতে চলে এসেছি। চারপাশে শুধু মেঘ আর মেঘের সমুদ্র। পাহাড়ের ঢালে নতুন জুম চাষের সবুজে মোড়ানো দৃশ্য আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয়। সন্ধ্যা নামার আগে আমরা চূড়া থেকে নেমে মেনিয়াংপাড়ার দিকে রওনা দেই। রাত ৮টার দিকে আমরা মেনিয়াংপাড়ায় পৌঁছাই। দুই দিন পর এখানে আমরা মোবাইল নেটওয়ার্ক পাই, যা আমাদের পরিবারকে আমাদের সুস্থতার খবর জানাতে সাহায্য করে।
পরদিন সকালে মেঘে ঢাকা এক অসাধারণ পরিবেশে ডিম-খিচুড়ি দিয়ে নাস্তা সেরে আমরা মেনিয়াংপাড়া থেকে রওনা দেই জগচন্দ্রপাড়ার দিকে। এখান থেকে নৌকা করে তৈন খালের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা আমতলী ঘাটে পৌঁছাই। সেখান থেকে চান্দের গাড়িতে করে চকরিয়া গিয়ে ঢাকার বাসে উঠি। ঢাকায় ফিরে আসি একরাশ নতুন গল্প আর স্মৃতি নিয়ে, যা আমার সারাজীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে। এই পুরো ভ্রমণটি ছিল এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা, যা আমি উৎসর্গ করছি খেমচং পাড়ার ছোট্ট শিশু মিংসিয়াই-কে।