সৌরজগতের জন্মরহস্যে নতুন মোড়: একটি উল্কাপিণ্ড বদলে দিল দীর্ঘদিনের ধারণা

মহাবিশ্বের অপার রহস্যের এক ক্ষুদ্র অংশ হলো আমাদের সৌরজগৎ। এর জন্ম ও বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে গবেষণা করে চলেছেন। এত দিন পর্যন্ত একটি প্রচলিত ধারণা ছিল যে, সৌরজগতের ভেতরের ও বাইরের পাথুরে গ্রহগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে গঠিত হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি একটি উল্কাপিণ্ড নিয়ে করা গবেষণা সেই পুরোনো ধারণাকে সম্পূর্ণ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মাত্র ৫০ গ্রাম ওজনের এই ক্ষুদ্র উল্কাটি আমাদের সৌরজগতের জন্মরহস্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

‘নর্থওয়েস্ট আফ্রিকা ১২২৬৪’ নামের এই উল্কাপিণ্ডটি কোনো সাধারণ পাথর নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি এসেছে গ্রহাণুপুঞ্জের (asteroid belt) একেবারে বাইরের অঞ্চল থেকে। যুক্তরাজ্যের ‘দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি’র বিজ্ঞানী ড. বেন রাইডার-স্টোকসের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই উল্কার রাসায়নিক গঠন, বিশেষ করে এর মধ্যে থাকা ক্রোমিয়াম ও অক্সিজেন আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে এর উৎস নিশ্চিত করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে তথ্যটি উঠে এসেছে, তা হলো এর বয়স। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই উল্কাটির বয়স প্রায় ৪৫৬ কোটি বছর।

এই তথ্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এটি আমাদের সৌরজগতের ভেতরের গ্রহ, যেমন পৃথিবী ও মঙ্গলের প্রাচীন আগ্নেয় শিলার বয়সের প্রায় সমান। এই আবিষ্কার দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে, যেখানে মনে করা হতো যে বৃহস্পতি বা তার বাইরের পাথুরে গ্রহগুলো, যেখানে পানি ও বরফের উপস্থিতি বেশি, সেগুলো অভ্যন্তরীণ গ্রহগুলোর ২০-৩০ লাখ বছর পরে গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ, ভেতরের গ্রহগুলো দ্রুত তৈরি হলেও বাইরের গ্রহগুলো গঠন হতে সময় নিয়েছিল।

কিন্তু নতুন এই গবেষণা বলছে, সৌরজগতের ভেতরের ও বাইরের পাথুরে গ্রহগুলোর ভিতরের স্তর বা গঠন প্রক্রিয়া (differentiation) প্রায় একই সময়ে শুরু হয়েছে। এটি এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে গ্রহ গঠনের সময়কাল-সংক্রান্ত ধারণায়। এই নতুন প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সমগ্র সৌরজগৎজুড়ে গ্রহ গঠন প্রক্রিয়া একই সময়ে ও একই গতিতে শুরু হয়েছিল, যা আগে ভাবা হয়নি।

বিজ্ঞানীরা আরও মনে করেন, এই গবেষণা শুধুমাত্র আমাদের সৌরজগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের গ্যালাক্সির অন্যান্য তারাকে ঘিরে থাকা গ্যাস ও ধুলার চক্র (protoplanetary disks) নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এর মাধ্যমে অন্য তারার চারদিকে কিভাবে গ্রহ গঠিত হয়, সে সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

এই ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডটি প্রমাণ করেছে যে, মহাকাশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুও বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে বিজ্ঞানের জগতে। এই আবিষ্কার শুধু পৃথিবীর ইতিহাস নয়, মহাবিশ্বের অন্যান্য স্থানে পৃথিবীর মতো গ্রহ কোথায় এবং কীভাবে তৈরি হতে পারে, তা বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন দিশা দেখাতে পারে। ভবিষ্যতের গবেষণা হয়তো এই ধারণাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করবে এবং সৌরজগতের জন্ম নিয়ে আমাদের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করবে।