প্রকৃতির কান্না: সাদা পাথর লুটের তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট

সিলেটের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর এলাকায় নির্বিচারে পাথর লুটের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধ্বংসের প্রতিবাদে অবশেষে উচ্চ আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে বিষয়টি। সম্প্রতি, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পাথর লুটের ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ১৪ আগস্ট, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মীর একেএম নূরুন নবী এই রিটটি দায়ের করেন। তিনি জানান, রিটে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভোলাগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের আবেদন জানানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, পাথর লুটের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও রুল জারির আবেদন জানানো হয়েছে। রিটে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এই রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, পরিবেশ সচিব, আইজিপি, সিলেট জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) মোট ১০ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।

এই রিটটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ এটি কেবল সাদা পাথর লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে, তার জন্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। এটি স্পষ্ট যে, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশেই এই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ সম্ভব হয়েছে।

 

প্রশাসন কি সত্যিই আন্তরিক?

 

সাদা পাথর নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট দায়েরের ঠিক আগের দিন, বুধবার রাতে, সিলেট জেলা প্রশাসন একটি সমন্বয় সভা করে। এই সভায় পাথর লুটপাট ঠেকাতে এবং চুরি যাওয়া পাথর ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পাঁচ দফা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তগুলো ছিল:

  • জাফলং ইসিএ এলাকা এবং সাদা পাথর এলাকায় ২৪ ঘণ্টা যৌথ বাহিনীর টহল থাকবে।
  • গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের চেকপোস্টগুলোতে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
  • অবৈধ ক্রাশিং মেশিন বন্ধ করার জন্য অভিযান চালানো হবে এবং এগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে।
  • পাথর চুরির সাথে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হবে এবং আইনের আওতায় আনা হবে।
  • চুরি হয়ে যাওয়া পাথর উদ্ধার করে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তগুলো প্রশংসনীয় হলেও, এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। অতীতেও এই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব নির্দেশনা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোয়ারি থেকে পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তার সুযোগে প্রভাবশালী মহলগুলো আবারও পাথর লুটপাটে মেতে উঠেছে।

 

হুমকির মুখে পর্যটন শিল্প এবং প্রাকৃতিক সম্পদ

 

ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর কেবল একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এর আশেপাশে অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। কিন্তু নির্বিচারে পাথর লুটের কারণে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি পর্যটন শিল্পও হুমকির মুখে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর যোগসাজশে এই লুটপাট চলছে। এর ফলে, প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠী।

হাইকোর্টের রিট এবং জেলা প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্তগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে হয়তো সিলেটের এই প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করা সম্ভব। তবে, শুধু নির্দেশনা বা সিদ্ধান্ত নয়, এর কঠোর প্রয়োগই পারে এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করতে। এটি কেবল একটি রিট বা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, এটি আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পরিবেশ রক্ষার লড়াই।