প্রতিনিধি ১৫ অগাস্ট ২০২৫ , ১০:৩৪ এএম প্রিন্ট সংস্করণ
আজ, ১৫ আগস্ট, ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায়ের ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৭৫ সালের এই দিনে মুক্তি পেয়েছিল যে সিনেমা, তা কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব। সেই বিপ্লবের নাম ‘শোলে’। অখ্যাত রামগড় গ্রামের প্রেক্ষাপটে দুই বন্ধু জয় ও বীরুর ডাকাত গব্বর সিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প আজও সমান প্রাসঙ্গিক, যেন গতকালই মুক্তি পেয়েছে।
‘শোলে’ শুধুমাত্র বড় বাজেটের সিনেমা ছিল না, বরং তা বলিউডের চিরাচরিত ধারা ভেঙে দিয়েছিল। পরিচালক রমেশ সিপ্পির দূরদর্শিতা, সেলিম-জাভেদ জুটির বাস্তবধর্মী চিত্রনাট্য, আর ডি বর্মনের অমর সুর — সবকিছু মিলে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। চলচ্চিত্র সমালোচক ইয়াসির উসমান যেমনটা বলেন, ‘এই ছবি চারটি বড় বলিউডি ছাঁচ ভেঙে দিয়েছিল, তাই আজও শোলে প্রাসঙ্গিক।’
ধূসর চরিত্রের নায়ক: এক নতুন দিগন্ত
‘শোলে’র আগে বলিউড নায়কদের এক ত্রুটিহীন, আদর্শবাদী চরিত্রে দেখা যেত। তারা যেন কোনো ভুলই করতে পারত না। কিন্তু জয় (অমিতাভ বচ্চন) ও বীরু (ধর্মেন্দ্র) সেই ধারণাকে ভেঙে দেন। তারা ছিলেন প্রাক্তন কয়েদি, পেশাদার চোর, বাস্তবজীবনের মতোই ভালো-মন্দের মিশেলে তৈরি। জীবনের এক কঠিন মুহূর্তে এসে এই দুই ‘ধূসর’ চরিত্রই রামগড়ের মুক্তিদূত হয়ে ওঠে। ইয়াসির উসমানের মতে, ‘নায়ক মানে ত্রুটিহীন হওয়া নয়, বরং বিপদের মুখে দাঁড়ানোর সাহস।’ এই চরিত্রায়ণ বলিউডকে শিখিয়েছিল যে একজন নায়কও মানুষ, তারও অতীত আছে, ত্রুটি আছে।
বন্ধুত্বের বাস্তব চিত্রায়ন
সিনেমাটি বন্ধুত্বের এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিল। এর আগে হিন্দি সিনেমায় বন্ধুত্বকে প্রায় প্রেমের মতোই রোমান্টিক করে দেখানো হতো। কিন্তু জয়-বীরুর বন্ধুত্ব ছিল বাস্তবের প্রতিচ্ছবি। সেখানে খুনসুটি ছিল, ঝগড়া ছিল, কিন্তু ছিল একে অপরের জন্য জীবন দেওয়ার মতো দৃঢ় বন্ধন। জাভেদ আখতারের কথায়, ‘এই ধরনের বাস্তবসম্মত বন্ধুত্বের উপস্থাপন পরবর্তী দশকগুলোতে বলিউডের জন্য এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করে।’
কর্মজীবী নারী ও প্রগতিশীল প্রেম
শোলের নারী চরিত্রগুলোও ছিল প্রথাবিরোধী। হেমা মালিনী অভিনীত বাসন্তী চরিত্রটি ছিল স্বাধীন, স্বনির্ভর এবং কর্মঠ। তিনি ছিলেন একজন টাঙাওয়ালি, যিনি নিজের জীবন ও জীবিকার সিদ্ধান্ত নিজেই নিতেন। বাসন্তী শুধু নারী স্বাধীনতার প্রতীক ছিলেন না, বরং বলিউডে কর্মজীবী নারীর চরিত্রায়ণের পথপ্রদর্শকও ছিলেন।
অন্যদিকে, বিধবা রাধার (জয়া ভাদুড়ি) জীবনে দ্বিতীয় বিয়ের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে যে সংলাপ, তা ছিল সময়ের চেয়েও অনেক এগিয়ে। যখন রাধার বাবা সমাজের ভয়ে মেয়ের দ্বিতীয় বিয়ে দিতে ইতস্তত করেন, তখন ঠাকুর (সঞ্জীব কুমার) বলেন, ‘সমাজ মানুষকে একা ফেলে রাখার জন্য নয়।’ এই সংলাপটি সে সময় এক সাহসী সামাজিক বার্তা দিয়েছিল।
অমর সংলাপ ও চিরন্তন জনপ্রিয়তা
৫০ বছর পার হয়ে গেলেও শোলের সংলাপ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ‘কিতনে আদমি থে?’, ‘বাসন্তী, ইন কুত্তোঁকে সামনে মাত নাচনা’, ‘গব্বর কা দেমাগ খারাব হো গয়া হ্যায়’ — এমন অসংখ্য সংলাপ কালজয়ী হয়ে উঠেছে। এই সিনেমার চরিত্রগুলো কেবল পর্দাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বাস্তব জীবনেও মিশে গেছে। সিনেমাটি যেন এক প্রজন্মের স্মৃতি। এর বিদ্রোহী চেতনা, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি আর মানবিক আবেদন আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
প্রথমদিকে সংশয়, পরে কালজয়ী সাফল্য
শুরুতে অবশ্য ‘শোলে’র ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ছিল। ১ কোটি রুপি বাজেটে শুরু হলেও নানা কারণে বাজেট প্রায় তিন গুণ বেড়ে যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সিনেমাটি মুক্তি পেলেও প্রথম সপ্তাহে তেমন দর্শক টানতে পারেনি। সমালোচকরাও এর সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দর্শক আবার হলে ফিরে আসতে শুরু করে, যা এক অনন্য ঘটনা। এরপর থেকেই এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং এটি বক্স অফিসের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। সিনেমাটি টানা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে হলে চলে, যা সিনেমার ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
‘শোলে’র জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে পৌঁছেছিল যে, এর সংলাপের আলাদা অডিও ক্যাসেট ও রেকর্ড প্রকাশ করতে হয়েছিল, যা সে সময় প্রায় পাঁচ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। সিনেমার খলনায়ক গব্বর সিংয়ের জনপ্রিয়তা নায়ককেও ছাড়িয়ে যায়। ‘শোলে’ বিবিসি ইন্ডিয়ার জরিপে ‘শতাব্দীর সেরা সিনেমা’ এবং ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট কর্তৃক ভারতের সেরা সিনেমা হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। এটি শুধুই একটি সিনেমা নয়, বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে প্রেরণার উৎস। অমিতাভ বচ্চনের মতে, ‘এই সিনেমা শুট করার সময় বুঝিনি এটা এত বিখ্যাত হবে, তবে এটা আমার জীবনের এক স্মরণীয় সময় ছিল।’
৫০ বছর পরেও ‘শোলে’ যেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতো — যার সূর্য কখনো অস্ত যায় না।