এলপিজি ব্যবসার আড়ালে ভূতুরে কারবার: মৃত ব্যক্তি ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি টাকার গ্যাস চুরি!

বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে একটি বড় দুর্নীতির চিত্র সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি (এসএওসিএল)-এর এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহে ধরা পড়েছে গুরুতর জালিয়াতি। মৃত ব্যবসায়ী, বছরের পর বছর ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা ডিলার এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে লাখ লাখ টাকার গ্যাস চুরি হয়েছে। এই কেলেঙ্কারির খবর সামনে আসার পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

কক্সবাজারের চকরিয়া এলাকার ব্যবসায়ী ফরিদুল আলম ২০২০ সালে মারা যান। তার মৃত্যুর পর তার প্রতিষ্ঠান ‘বস অ্যান্ড কোং’ গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ফরিদুল আলমের মৃত্যুর পরেও তার প্রতিষ্ঠানের নামে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৪০০ সিলিন্ডার খালাস হয়েছে! ফরিদুল আলমের ছেলে আরিফুল আলম এই বিষয়ে কিছুই জানতেন না। বিষয়টি জানতে পেরে গত ২২শে মে তিনি এসএওসিএলে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

শুধু মৃত ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানই নয়, এই কেলেঙ্কারির বিস্তৃতি আরও বড়। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, গত ৫ বছরে ৮০টি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৬৯ হাজার সিলিন্ডার অবৈধভাবে খালাস করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২১টি প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্বই নেই, ৫টি প্রতিষ্ঠান নিষ্ক্রিয় এবং ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের বিস্ফোরক লাইসেন্সের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে।

এসএওসিএলের নিজস্ব তদন্তে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মেসার্স সামিয়া এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় গিয়ে কর্মকর্তারা কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। অথচ এই প্রতিষ্ঠানের নামে গত ৫ বছরে প্রায় ১ হাজার ২৯০টি সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে। একইভাবে বরিশাল, খুলনা ও ঝালকাঠির ১৪টি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ১৫ হাজার সিলিন্ডার গায়েব হয়েছে।

আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ঘটেছে। মেসার্স বশির অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক বশির আহমদ গত ১১ বছর ধরে এসএওসিএল থেকে কোনো সিলিন্ডার নেননি। তবুও তার প্রতিষ্ঠানের নামে গত ৫ বছরে ৯১০টি সিলিন্ডার খালাস হয়েছে। খবরটি শুনে তিনি অবাক হয়ে জানতে চেয়েছেন, ‘আমার গ্যাস কে নিল?’ একই রকম অভিযোগ করেছেন ঢাকার খিলক্ষেতের আরেক ব্যবসায়ী মতিউল ইসলাম। তার প্রতিষ্ঠানের নামেও প্রায় দেড় হাজার সিলিন্ডার অবৈধভাবে খালাস হয়েছে, যা তিনি জানতে পারেন সম্প্রতি।

এই কেলেঙ্কারির পেছনে এসএওসিএলের কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। একজন পরিবেশক মাসে সর্বোচ্চ ১০০টি সিলিন্ডার নিতে পারেন। কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কিছু অসাধু কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে পছন্দের পরিবেশকদের কাছে অতিরিক্ত সিলিন্ডার বিক্রি করেছেন। বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৪০০-৫০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় প্রতিটি সিলিন্ডারে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা লাভ হয়েছে।

এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর বিপিসি গত ৬ আগস্ট থেকে এসএওসিএলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমও এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এই কেলেঙ্কারি শুধু আর্থিক জালিয়াতি নয়, এটি একটি পুরো সিস্টেমের ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে দিয়েছে। মৃত ব্যক্তি এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে লাখ লাখ টাকার গ্যাস কীভাবে বের হলো, এই গ্যাস কোথায় গেল এবং এর পেছনের মূল হোতারা কারা, তা দ্রুত খুঁজে বের করা প্রয়োজন