৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন: সরগরম ক্যাম্পাস, প্রার্থীরা প্রস্তুত, ভোট হবে ১১ সেপ্টেম্বর

দীর্ঘ ৩৩ বছরের প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি)। ক্যাম্পাসে এখন উৎসবের আমেজ, কারণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণা হয়েছে এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকাতে নাম উঠেছে ১১,৯১৯ জনের। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ, আবাসিক হল থেকে শুরু করে বটতলা, ক্যাফেটেরিয়া ও চৌরঙ্গী পয়েন্ট পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণবন্ত আলোচনা চলছে। সবার প্রত্যাশা, নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের অধিকার ও সার্বিক কল্যাণে কাজ করবেন।

মনোনয়নপত্র সংগ্রহে সাড়া, প্রস্তুত ছাত্রসংগঠনগুলো

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জাকসু নির্বাচনের জন্য দুই দিনে মোট ৩২৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে জাকসুর জন্য ৮৭ জন এবং হল সংসদের জন্য ২৪১ জন। শিক্ষার্থীদের অনুরোধের ভিত্তিতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময়সীমা ২১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহের মাত্রা প্রকাশ করে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এখন প্যানেল গঠনে ব্যস্ত। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে চলছে গভীর আলোচনা। মতাদর্শের ভিত্তিতে জোট গঠনের বিষয়েও ভাবনা চলছে। তবে এই নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে কিছু অভ্যন্তরীণ কোন্দলও দেখা যাচ্ছে।

যেমন, শাখা ছাত্রদলের মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট। ৮ আগস্ট ১৭টি আবাসিক হল ও শাখা কমিটি বর্ধিত করার পর নতুন কমিটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদ দেওয়ার অভিযোগে একটি অংশ বিক্ষোভ করে। এই বিদ্রোহী গ্রুপ ক্যাম্পাসে নিয়মিত শোডাউন করছে এবং শাখা ছাত্রদলের সুপার ফাইভের নেতাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, ছাত্রদল থেকে এবার দুটি প্যানেল হতে পারে—একটি মূল অনুসারীদের এবং অন্যটি বিদ্রোহী গ্রুপের।

শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর জানিয়েছেন, তারা জাকসুর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল তৈরি করছেন। দলের সবার সঙ্গে আলোচনার পর ২৫ আগস্ট খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর প্যানেল ঘোষণা করা হবে। তিনি বলেন, “দলের সবার সঙ্গে আলোচনার পর ২৫ তারিখে খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর জাকসু ও হল সংসদের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করব। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের সার্বিকভাবে পরামর্শ দিয়েছেন।”

অন্যদিকে, প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তত দুটি প্যানেল হওয়ার গুঞ্জন রয়েছে। একটি প্যানেলে থাকতে পারে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ, জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট এবং বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীসহ কয়েকটি সমমনা সাংস্কৃতিক সংগঠন। অন্য প্যানেলে থাকতে পারে ছাত্র ইউনিয়নের অপর অংশ এবং জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার।

৩৬ বছর পর প্রকাশ্যে রাজনীতিতে এসেছে ছাত্রশিবির। সর্বশেষ জাকসু নির্বাচনে তারা অংশ নেয়নি। সংগঠনটির দপ্তর ও প্রচার সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, তাদের একক প্যানেল প্রস্তুত রয়েছে, তবে তারা এখনো অনেকের সঙ্গে আলোচনা করছেন।

এছাড়া, প্রথমবারের মতো জাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ। তারা এককভাবে প্যানেল ঘোষণার কথা ভাবছে, তবে অন্য সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনার সুযোগও রাখছে। গণ-অভ্যুত্থানে অবদান রাখা আব্দুর রশিদ জিতু এবং ছাত্রফ্রন্টের সংগঠক সোহাগী সামিয়াও পৃথক প্যানেল নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, যা নির্বাচনের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে।

প্রার্থী নয়, সংগঠন নয়, যোগ্যতা দেখেই ভোট দেবেন শিক্ষার্থীরা

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এবার তারা কোনো দলীয় মতাদর্শ বা সংগঠনের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার আগ্রহ দেখে ভোট দেবেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব বলেন, “আমি তাকেই ভোট দেবো যে প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করবে, যে কখনো আপস করবে না।” তিনি আরও বলেন, “যে সবচেয়ে কম টাকা খরচ করবে তাকেই বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ এটা কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান না। যে বেশি অর্থ খরচ করবে সে নির্বাচিত হলে তার একটা টেন্ডেন্সি থাকবে সেই অর্থ তোলার তাই সে বিক্রিও হতে পারে। তাই এসব বিষয় বিবেচনা করে আমাদের প্রার্থী বাছাই করতে হবে।” আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী সিয়ামের মতে, প্রার্থীর অভিজ্ঞতা এবং দলমত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার ইচ্ছাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মোট ভোটার ১১,৯১৯ জন

প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ভোটার ১১,৯১৯ জন। এর মধ্যে ছাত্র ভোটার ৬,১০২ জন এবং ছাত্রী ভোটার ৫,৮১৭ জন। নির্বাচন কমিশন ৭ দফা নির্দেশনা জারি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে একজন প্রার্থীর একাধিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারা, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র জমা দেওয়া ইত্যাদি।

নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সকল প্রকার অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ, কর্মসূচি এবং ২৫ জনের বেশি লোকের জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে, যাতে নির্বিঘ্নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব এ কে এম রাশিদুল আলম জানান, “নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলোতে আমরা সতর্ক রয়েছি। নির্বাচনে প্রার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে প্রচার চালাতে পারে এবং ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, সেই পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।”

এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আবারও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছে। এখন দেখার পালা, কারা এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে।