‘টায়ার্ড গার্ল’ মেকআপ: ক্লান্তি এখন ফ্যাশন!
ফ্যাশন আর মেকআপের দুনিয়া বরাবরই নতুনত্বের সন্ধানে থাকে। একটা সময় ছিল, যখন মেকআপের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল চেহারার খুঁতগুলো ঢেকে ফেলা, নিজেকে আরও সতেজ আর ঝলমলে দেখানো। চোখের নিচে কালো দাগ, ফ্যাকাশে ত্বক কিংবা ক্লান্তির ছাপ—এসবকেই মনে করা হতো অসুস্থতা বা বার্ধক্যের লক্ষণ। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই ধারণা এখন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। বর্তমান প্রজন্ম, বিশেষ করে জেনারেশন জেড, এখন মেতেছে এক নতুন ট্রেন্ডে, যার নাম ‘টায়ার্ড গার্ল’ মেকআপ। এই মেকআপ লুকে চোখের নিচের কালি, ফ্যাকাশে ঠোঁট আর মলিন মুখই এখন সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞা।
এই অভিনব মেকআপ ট্রেন্ডের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট একটি দর্শন—যা কিছু এতদিন লুকানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তাকেই এখন বুকভরে বরণ করে নেওয়া। কনসিলার, আই ক্রিম বা কারেক্টিং স্টিকের মতো প্রসাধনীগুলো যেখানে ক্লান্তি লুকানোর জন্য ব্যবহৃত হতো, সেখানে ‘টায়ার্ড গার্ল’ লুকের মূলমন্ত্র হলো সেই ক্লান্তিকেই সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলা। এই ট্রেন্ডটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ‘#tiredgirlmakeup’ হ্যাশট্যাগে হাজার হাজার ভিডিও তৈরি হচ্ছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই ৩ লাখেরও বেশি ভিউ পেয়েছে।
এই ট্রেন্ডের জন্মদাত্রী হিসেবে কৃতিত্ব দেওয়া হয় জনপ্রিয় অভিনেত্রী জেনা ওর্তেগা-কে। নেটফ্লিক্সের সুপারহিট সিরিজ ‘ওয়েডনেসডে’-তে তার চরিত্রটি ছিল অনেকটা বিষণ্ণ ও রহস্যময়। আর সেই চরিত্রের মেকআপেই দেখা যায় এই বিশেষ লুক—হালকা স্মাজড আইশ্যাডো, ফ্যাকাশে গাল আর চোখের নিচে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি কালো দাগ। সিরিজের সাফল্যের পর জেনা যখন লন্ডনে নতুন মৌসুমের প্রিমিয়ারে রেড কার্পেটে একই সাজে উপস্থিত হন, তখন থেকেই এই লুকটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং এটি একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়।
তবে জেনারেশন জেড-এর কাছে এটি নতুন হলেও আগের প্রজন্মের দর্শকদের কাছে এই ধরনের লুক মোটেও অপরিচিত নয়। অনেকে স্মরণ করবেন ১৯৯৯ সালের বিখ্যাত সিনেমা ‘গার্ল, ইনটারাপটেড’-এ অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি-র সাজ অথবা ১৯৯৪ সালের আরেক কাল্ট ক্লাসিক ‘লিওন: দ্য প্রফেশনাল’-এ শিশুশিল্পী হিসেবে নাটালি পোর্টম্যান-এর লুক। তাদের সেই সময়ের মেকআপ স্টাইলের সঙ্গে বর্তমানের ‘টায়ার্ড গার্ল’ লুকের বেশ মিল রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ফ্যাশন কেবল সময়ের সঙ্গে পাল্টায় না, বরং বারবার ফিরেও আসে।
বর্তমান সময়ে জেনা ওর্তেগা ছাড়াও আরও অনেক তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সার এই ট্রেন্ডের অনুসরণ করছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—জনপ্রিয় অভিনেতা জনি ডেপের মেয়ে লিলি রোজ ডেপ, মডেল ও সংগীতশিল্পী গ্যাব্রিয়েট, এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার এমা চেম্বারলেইন, ড্যানিয়েল মারকান ও লারা ভায়োলেটা। তাদের অনুসরণ করে অসংখ্য তরুণী এই মেকআপ লুকটি নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নিচ্ছেন।
এই ট্রেন্ড শুধু ফ্যাশন নয়, এটি যেন এক ধরনের নীরব প্রতিবাদও। এটি প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণাকে ভেঙে দিচ্ছে এবং মানুষের অসম্পূর্ণতাকে মেনে নেওয়ার একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ‘টায়ার্ড গার্ল’ মেকআপের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্ম যেন বলছে—নিজেকে নিখুঁত দেখানোর চাপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্লান্তি, মলিনতা বা অসম্পূর্ণতাও যে সুন্দর হতে পারে, এই ট্রেন্ডটি যেন তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি মেকআপের সেই প্রচলিত ধারাকে চ্যালেঞ্জ করছে, যেখানে নিখুঁত ত্বক আর ঝলমলে চেহারাই ছিল একমাত্র কাম্য। তাই বলা যায়, ‘টায়ার্ড গার্ল’ মেকআপ শুধু একটি মেকআপ লুক নয়, এটি একটি জীবনদর্শন।