দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন মোড়: বাংলাদেশের সঙ্গে ১৫ বছরের অচলাবস্থা ভাঙতে তৎপর পাকিস্তান

গত ১৫ বছর ধরে ভারত-নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে বাংলাদেশ এখন বহুমুখী কূটনীতির পথে হাঁটছে। এই পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ককে নতুন করে সাজাতে চাইছে পাকিস্তান। গত দুই দশকে অনেকটাই স্থবির থাকা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠায় দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারসহ দেশটির তিন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঢাকা সফর এই সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধিরই ইঙ্গিত। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রাজা নাকভি ইতিমধ্যেই ঢাকা সফর করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এছাড়াও তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথেও সাক্ষাৎ করেন।

এই সফরগুলো দুই দেশের বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবিরের মতে, ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে উভয় দেশই উপকৃত হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য তুলা আমদানি করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দূরবর্তী দেশ থেকে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে, বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তারা খুব সহজেই পাকিস্তান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে তুলা আমদানি করতে পারবেন।

প্রতিরক্ষা খাতেও দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব কমছে। উচ্চপর্যায়ে যাতায়াত এবং যোগাযোগ বাড়ায় ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা খাতে ক্রয়-বিক্রয়ের সম্পর্ক আরও জোরদার হতে পারে। এই বিষয়টির ওপর ভারতসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলো নিবিড় নজর রাখছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরে বারবার সার্ক (দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) প্রসঙ্গ এসেছে। হুমায়ুন কবিরের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে ভারত যদি আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব উপলব্ধি করে, তাহলে সার্ক আবারও সক্রিয় হতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একে অপরের সহযোগিতা পেতে পারে।

তবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন হুমায়ুন কবির। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ স্থল ও জলসীমানা থাকায় দিল্লির উদ্বেগ ও সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কারণ, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্মানজনক সম্পর্ক না থাকলে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

মার্কিন বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা হওয়া গত এক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারসের এই পরিচালক বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পরই বোঝা যাবে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন হলেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো এখনো একটি বড় বাধা। পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিকদের দাবি, পাকিস্তান দুইবার ক্ষমা চেয়েছে। তবে এই বিতর্কিত বিষয়টি সমাধান না হলে দুই দেশের সম্পর্কের মাঝে বারবার এর প্রভাব পড়তে থাকবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, একাত্তরের প্রসঙ্গ সামনে এলেও দুই দেশ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যিক সম্পর্ক চালিয়ে যাবে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্য মাত্র ১০০ কোটি ডলার। তুলা, কাপড় এবং অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি-রপ্তানি বাড়িয়ে এই বাণিজ্য ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। তবে সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির জন্য পাকিস্তানের উচিত ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়ে এই অধ্যায়ের ইতি টানা।