তারকা বাড়ি’র তারকাদের বিপদ: ফ্ল্যাট ভেঙে ফেলা হবে, ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে উত্তরার প্রিয়াংকা রানওয়ে সোসাইটির একটি ভবন এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘তারকা বাড়ি’ নামে। কারণ, এই আটতলা ভবন, যার নাম ভার্টিকেল-২, কিনেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। কিন্তু ভবনটির উচ্চতা নিয়ে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের নতুন নির্দেশনা বিপাকে ফেলেছে তারকাদের। এখন প্রশ্ন উঠেছে, নিজেদের ভুল স্বীকার করেও এই ক্ষতির দায়ভার কে নেবে?

২০১৯ সালে জনপ্রিয় তারকা দম্পতি মাসুম বাসারমিলি বাসার এই ভবনের অষ্টম তলায় একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৪ সালে তারা ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রিও সম্পন্ন করেন। একই ভবনে ফ্ল্যাট আছে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী, নাট্যপরিচালক হিমু আকরাম এবং অভিনেত্রী নাবিলা ইসলামের। এছাড়াও, শামীম জামান, নিলয়, শ্যামল মাওলা, সামিয়া অথৈ, সাজু খাদেম, আ খ ম হাসান, নাজিয়া হক অর্ষা ও তাঁর স্বামী মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, এবং আরফান আহমেদ-এর মতো আরও অনেক তারকাই এই ভবনের বাসিন্দা।

সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বলছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও বিমান চলাচলের সুবিধার্থে ভার্টিকেল-২ সহ মোট ৮৭টি ভবনের উচ্চতা নীতি লঙ্ঘন করা হয়েছে। সংস্থাটির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ভবনের আটতলা ও ছাদের উপরের বাড়তি অংশ, অর্থাৎ সিঁড়িঘর, পানির ট্যাংক, লিফটের মেশিন ঘর, বাউন্ডারি ওয়াল, অ্যানটেনা ও খুঁটিসহ প্রায় ৩৩ ফুট ভেঙে ফেলতে হবে। এটি ভবনটির মালিকদের পাশাপাশি ফ্ল্যাট মালিকদের জন্য এক বড় দুঃসংবাদ।

বিপাকে অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং ভবন মালিক

 

ভার্টিকেল-২ ভবনের মালিক সৌরভ রহমান জানান, ২০১৯ সালে সিভিল এভিয়েশনের দেওয়া নির্দেশনা মেনেই তারা ভবন নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু এখন সিভিল এভিয়েশন উচ্চতা পুনর্নির্ধারণ করায় তারা বিপদে পড়েছেন। সৌরভ রহমানের মতে, নির্মাণ অনুমোদনের বাইরে যতটুকু বাড়তি অংশ তৈরি হয়েছে, তা তারা ভেঙে ফেলবেন। কিন্তু সিভিল এভিয়েশনের আগের দেওয়া অনুমোদনের ভিত্তিতে তৈরি আটতলা ভবনটি ভাঙলে তাদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

একই সমস্যায় পড়েছেন ফ্ল্যাট মালিকেরাও। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, “দুই প্রতিষ্ঠানের (সিভিল এভিয়েশন ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রিয়াংকা) ভুলের কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছি। অভিনয়শিল্পীদের এই অসহায়ত্বের কথা কার কাছে বলব?” অভিনেতা মাসুম বাসারও একই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নথিপত্র দেখেই আমরা ফ্ল্যাট কিনেছি। এখন সিভিল এভিয়েশনের ভুলে ফ্ল্যাট ভেঙে ফেলা হলে আমাকে ক্ষতিপূরণ কে দেবে?”

কর্তৃপক্ষের দোষ স্বীকার, কিন্তু সমাধান কোথায়?

 

সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ও রাজউক-এর মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, “ভুলটা আসলে সিভিল এভিয়েশন করেছে। তাদের দেওয়া ছাড়পত্র নিয়েই প্রিয়াংকা রানওয়ে সোসাইটি ওই ভবনগুলো করছে। রাজউকের সঙ্গে মিটিংয়ে সংস্থাটি ভুল স্বীকারও করেছে।” তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে তারা চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (এয়ার ট্র্যাফিক ম্যানেজমেন্ট) গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. নূর-ই-আলম জানান, প্রিয়াংকা রানওয়ে সোসাইটির ভবন তৈরির নকশায় ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নির্ণয়ে ত্রুটি ছিল, যার কারণে উচ্চতা নিয়ে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। নতুন আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিমান ওঠানামার জন্য রানওয়ের দৃশ্যমানতা বাড়ানো হয়েছে, যা এই ভবনগুলোর উচ্চতার সাথে সাংঘর্ষিক।

 

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

 

এই ঘটনার কারণে কেবল ভার্টিকেল-২ নয়, বরং ওই এলাকার মোট ছয়টি ভবনের ১০৬টি ফ্ল্যাটের মালিকরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। প্রিয়াংকা সোসাইটির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, “আমরা যতটুকু অনুমোদন ছাড়া বানিয়েছি, তা ভেঙে ফেলব। কিন্তু সিভিল এভিয়েশনের ভুলের বিচার কে করবে?”

ক্ষতিপূরণ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো সমাধান এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাট মালিকরা যদি ক্ষতিপূরণ না পান, তাহলে উচ্চ আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে, বিমানবন্দরের আশেপাশের সব অবৈধ ভবন উচ্ছেদের বিষয়ে সিভিল এভিয়েশন ও রাজউক যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। প্রশ্ন থেকেই যায়, কর্তৃপক্ষের ভুলের মাশুল কেন সাধারণ মানুষ আর তারকাদের গুনতে হবে?