ধানমন্ডিতে কড়া নিরাপত্তা: ১৫ আগস্ট ঘিরে নাশকতা ঠেকাতে সতর্ক প্রশাসন
১৫ আগস্ট, বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। এই দিনেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। প্রতি বছর এই দিনটিকে ঘিরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে শোক ও শ্রদ্ধার পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে নির্বাসনের পর থেকেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, ১৫ আগস্টকে ঘিরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এবং নাশকতা ঠেকাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো এলাকাটি একপ্রকার নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে রাখা হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে যাওয়া সব ধরনের রাস্তা পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। কেবল গণমাধ্যমকর্মীদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ভাঙা বাড়ির সামনে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য। তাদের সতর্ক দৃষ্টি চারপাশের প্রতিটি ছোটোখাটো নড়াচড়ার ওপর। পুলিশ, র্যাব এবং আনসার সদস্যরা সেখানে একযোগে দায়িত্ব পালন করছেন।
সকাল থেকেই ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের ভিড় ছিল। তবে তাদের অধিকাংশই স্থানীয় বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের রোষানলে পড়েন। বেশ কয়েকটি বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং তাদের সরিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যথেষ্ট সতর্ক।
এমনই একটি ঘটনার শিকার হন হালিমা নামের এক নারী। তিনি শেরেবাংলা নগর থেকে ফুল নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু সেখানে উপস্থিত উত্তেজিত জনতা তাকে ঘিরে ধরে। একপর্যায়ে পুলিশ তাকে রিকশায় করে নিরাপদে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাজনৈতিক উত্তেজনা এখনো বিদ্যমান এবং যেকোনো মুহূর্তে বড়ো ধরনের গোলযোগের সূত্রপাত হতে পারে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বৈরশাসন ও শত শত হত্যার অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যান। এরপরই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা হয় এবং ছয় মাস পর একটি বুলডোজার মিছিল থেকে বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই হামলার পর থেকেই ৩২ নম্বর ভবনটি এক শোকের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের কোনো নেতাকর্মী যেন একসঙ্গে সমবেত হতে না পারে সেদিকে নজর রাখছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, এই ধরনের সমাবেশ নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই প্রশাসন কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। ১৫ আগস্টকে ঘিরে যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এবং মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের শ্রদ্ধা জানাতে পারে, সে বিষয়ে সরকার সচেষ্ট। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার মূল লক্ষ্যই হলো এই এলাকার শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
তবে এই নিরাপত্তার মধ্যেও শোকের গভীরতা কোথাও যেন চাপা পড়ে না। ১৫ আগস্ট, যে দিনটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, সেই দিনের স্মৃতি বহন করে চলেছে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলেছে, কিন্তু এই শোকের দিনটি প্রতি বছরই ফিরে আসে গভীর বেদনার বার্তা নিয়ে। এই বেদনার দিনে, প্রশাসন সব ধরনের নাশকতা ঠেকিয়ে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করছে।