ভরসার বিমা এখন আস্থার সংকটে: হাজার কোটি টাকা আটকে, গ্রাহকের দুর্ভোগ চরমে
দেশের বিমা খাতে গ্রাহকের আস্থা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। ৪৬টি নন-লাইফ বিমা কোম্পানি মিলে গ্রাহকদের ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার বেশি দাবি আটকে রেখেছে। এর ফলে বিমার ওপর সাধারণ মানুষের ভরসা ক্রমশ কমছে। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
আইডিআরএর অনিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সাধারণ বিমায় মোট দাবির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৪৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অথচ এর মধ্যে মাত্র ২৯৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা দাবির বিপরীতে গ্রাহকরা পেয়েছে মাত্র সাড়ে আট টাকারও কম। বাকি প্রায় ৯১ টাকা এখনো ঝুলে আছে, যা এই খাতের আস্থার সংকটকে আরও গভীর করছে।
কেন এই দুর্ভোগ?
গ্রাহকদের দাবি মেটানোর ক্ষেত্রে বিমা কোম্পানিগুলোর নানা ধরনের টালবাহানা নতুন নয়। কাগজপত্র জমা দেওয়া, সার্ভে রিপোর্টের জটিলতা, পুনর্বিমার অজুহাত এবং অসংখ্য দরজায় ঘোরার পর অনেক গ্রাহক শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন। প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু কোম্পানি এই সমস্যাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
সিকদার ইনস্যুরেন্স এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। কোম্পানিটি ২৭ কোটি ১৩ লাখ টাকার দাবির মধ্যে মাত্র ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে, যা মোট দাবির মাত্র ০.১২%। অর্থাৎ, তাদের ৯৯.৮৮% দাবিই এখনো অনিষ্পন্ন।
দ্বিতীয় স্থানে আছে সেনা কল্যাণ ইনস্যুরেন্স, যারা ৪৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে মাত্র ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছে (০.৬%। তৃতীয় স্থানে থাকা নর্দান ইসলামী ইনস্যুরেন্স ৬৪ কোটি ৫২ লাখ টাকার মধ্যে দিয়েছে মাত্র ৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা (১.০৬%)। এছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ইনস্যুরেন্স এবং ঢাকা ইনস্যুরেন্স যথাক্রমে ১.৪৪% এবং ১.৫৯% দাবি পরিশোধ করেছে।
অধিকাংশ কোম্পানিই ব্যর্থ
প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে যে অধিকাংশ কোম্পানিই গ্রাহকদের দাবি নগণ্য হারে পরিশোধ করেছে। যেমন—পিপল ইনস্যুরেন্স ১.৮২%, ইস্টার্ন ইনস্যুরেন্স ৩.১৬%, দেশ জেনারেল ৩.৪৪%, এসবিসি ৩.৭৯%, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ৪.০১% এবং এশিয়া প্যাসিফিক ৪.২৯% দাবি নিষ্পত্তি করেছে।
কিছু কোম্পানি তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও তাদের পরিশোধের হার খুব বেশি নয়। পূরবী জেনারেল ৭.০৭%, সাউথ এশিয়া ৭.৮০%, প্যারামাউন্ট ৮.৮২%, ফনিক্স ৮.৪৬%, গ্রিন ডেলটা ৯.৪৭% এবং মার্কেন্টাইল ইসলামী ৯.৮৯% দাবি পরিশোধ করেছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ও কোম্পানির অজুহাত
আইডিআরএর চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম স্বীকার করেন যে দাবি নিষ্পত্তি না হওয়া এই খাতের প্রধান সমস্যা। তিনি বলেন, ‘সমস্যা শনাক্ত হয়েছে, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, শুধু আশ্বাসেই গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসবে না, বরং দৃশ্যমান পদক্ষেপের প্রয়োজন।
অন্যদিকে, কোম্পানিগুলো বরাবরই পুরনো অজুহাত দেয়। সিকদার ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রফিক বলেন, ‘বেশ কিছু দাবির টাকা সাধারণ বিমা করপোরেশনে (এসবিসি) আটকে আছে। এসবিসি থেকে টাকা পেলে আমরা পরিশোধ করব।’ সংশ্লিষ্টরা এই ধরনের যুক্তিকে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা বলে মনে করেন এবং প্রশ্ন তোলেন, পুনর্বিমার অজুহাতে কেন গ্রাহকদের ভোগান্তি হবে?
আশার আলোও আছে
এই হতাশাজনক চিত্রের মধ্যেও কিছু কোম্পানি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জনতা ইনস্যুরেন্স, ইউনিয়ন ইনস্যুরেন্স এবং প্রাইম ইনস্যুরেন্স দাবি নিষ্পত্তিতে সেরা অবস্থানে রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রমাণ করে যে সঠিক ইচ্ছা, সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা থাকলে গ্রাহকের অর্থ সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব। তাই এই সংকট কেবল টাকার ঘাটতি নয়, বরং শাসনব্যবস্থা ও দায়বদ্ধতার অভাবেরও ফলাফল।
খাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন, বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স ফোরামের জয়েন্ট সেক্রেটারি এস এম নুরুজ্জামান বলেন, আইডিআরএ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তিনি গ্রাহকদেরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন। দাবি উত্থাপনের সময় নির্ভুল কাগজপত্র জমা দেওয়া, যোগাযোগ নথিভুক্ত করা এবং ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলে আইডিআরএতে অভিযোগ করার মতো ধাপগুলো অনুসরণ করলে সমস্যার সমাধান পাওয়া সম্ভব।
তবে সামগ্রিকভাবে বিমা খাতের এই আস্থার সংকট দূর করতে কর্তৃপক্ষ এবং কোম্পানি উভয়েরই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। অন্যথায়, বিমা ব্যবস্থা জনগণের কাছে তার ভরসা সম্পূর্ণভাবে হারাবে।