সম্ভাবনা থেকে সংকটে ওটিটি: বাংলা কনটেন্টের ভবিষ্যৎ কি অনিশ্চিত?

একসময় বাংলাদেশের শোবিজ অঙ্গনে নতুন এক দিগন্তের সূচনা করেছিল ওভার-দ্য-টপ বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। দেশীয় নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য এটি ছিল নিজেদের মেধা প্রদর্শনের এক বিশাল মঞ্চ। অন্যদিকে, দর্শকরাও পেয়েছিলেন ভিন্নধর্মী ও মানসম্মত কনটেন্ট উপভোগের সুযোগ। কিন্তু সেই সম্ভাবনাময় যাত্রা যেন মাঝপথেই ঝিমিয়ে পড়েছে। চলতি বছরে হাতেগোনা কয়েকটি কনটেন্ট ছাড়া তেমন কোনো আলোচিত বা সফল কাজ আসেনি, যা ওটিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

একসময় হইচই, চরকি ও বিঞ্জ-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়মিতভাবে দারুণ সব অরিজিনাল কনটেন্ট উপহার দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছিল। তাকদীর, কারাগার বা মহানগর-এর মতো সিরিজগুলো নিয়ে দর্শকের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু চলতি বছরে সেই চিত্র অনেকটাই ফিকে। হইচই-এ এ বছর মুক্তি পেয়েছে মাত্র দুটি সিরিজ—আশফাক নিপুণের ‘জিম্মি’ এবং অমিতাভ রেজা চৌধুরীর ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি কিছুটা আলোচনায় এলেও তা আগের সাফল্যকে স্পর্শ করতে পারেনি। চরকির বহুল প্রতীক্ষিত সিরিজ **‘গুলমোহর’**ও আশানুরূপ সাড়া পায়নি। বিঞ্জ-এর মতো প্ল্যাটফর্মও দীর্ঘকাল ধরে কোনো উল্লেখযোগ্য নতুন কনটেন্ট আনেনি। বঙ্গ, আইস্ক্রিন, দীপ্ত প্লে-সহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলোর অবস্থাও প্রায় একই।

অরিজিনাল কনটেন্টের এই অভাব মেটাতে প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বড় পর্দার ছবি এবং টিভি নাটকের দিকে ঝুঁকছে। প্রায় সব প্ল্যাটফর্মেই নিয়মিত মুক্তি পাচ্ছে আলোচিত সিনেমাগুলো। এর পাশাপাশি কিছু পুরোনো টিভি নাটকও স্থান পাচ্ছে। কিন্তু এতে কি ওটিটির মূল উদ্দেশ্য সফল হবে? অরিজিনাল কনটেন্ট ছাড়া কি একটি প্ল্যাটফর্ম তার নিজস্বতা ধরে রাখতে পারে?

ওটিটির এই সংকটের পেছনে বেশ কিছু কারণ তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। হইচই বাংলাদেশের প্রধান সাকিব আর খান বলছেন, মূল সমস্যা হলো সাবস্ক্রিপশন ফি এবং পাইরেসি। তিনি বলেন, “বাঙালিরা ফ্রি কনটেন্ট দেখতে অভ্যস্ত। আমাদের আয়ের মূল উৎস হলো সাবস্ক্রিপশন, অথচ পাইরেসি আমাদের বিরাট ক্ষতি করে। একটি কনটেন্ট রিলিজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা পাইরেসি হয়ে যায়।” তিনি আরও যোগ করেন, বিদেশি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স-এর মতো বিশাল বিনিয়োগ বা সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা তাদের নেই। একই সঙ্গে, প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার অভাবকেও তিনি দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “এটা দেখানো যাবে না, ওটা করা যাবে না—এমন বিধিনিষেধের কারণে কাজের গতি এবং সংখ্যা কমাতে বাধ্য হয়েছি।”

তবে, এই অবস্থার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন আইস্ক্রিনের কনটেন্ট সুপারভাইজার অর্ক আসিফ জাহাঙ্গীর। তিনি মনে করেন, শুরুর দিকে নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের কনটেন্ট ভাণ্ডার পূর্ণ করতে প্রচুর কাজ তৈরি করে। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা কমে এলেও কনটেন্টের মান আগের চেয়ে ভালো হচ্ছে। তিনি জানান, আইস্ক্রিন নিয়মিতভাবে ওয়েব ড্রামা মুক্তি দিচ্ছে এবং চ্যানেলের পুরনো জনপ্রিয় কনটেন্টগুলোকেও প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করছে। তিনি আশাবাদী যে বছরে বড় পরিসরের এক-দুটি অরিজিনাল সিরিজ বা ফিল্ম নিয়ে আসার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।

ওটিটির এই সংকট সাময়িক হোক বা দীর্ঘস্থায়ী, এটি বাংলাদেশের বিনোদন শিল্পের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। পাইরেসি, সাবস্ক্রিপশন মডেলের দুর্বলতা এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা—এই সমস্যাগুলো সমাধান করা না গেলে ওটিটির সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। তবে, প্ল্যাটফর্মগুলো যদি মানসম্মত কনটেন্ট তৈরিতে মনোযোগী হয় এবং দর্শকও যদি সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে তাদের সমর্থন জানায়, তাহলে হয়তো এই শিল্প আবারও তার সোনালি দিন ফিরে পেতে পারে।