প্রতিনিধি ২৮ অগাস্ট ২০২৫ , ১:৩৫ পিএম প্রিন্ট সংস্করণ
এইডসের মতো মরণব্যাধিকে পরাজিত করার এক বিশাল স্বপ্ন দেখাচ্ছে রাশিয়া। যদি সব কিছু ঠিকঠাক চলে, তাহলে বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম এইডসের কোনো টিকা তৈরি করতে সফল হবে তারা। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা রিয়া নোভোস্তির বরাতে জানা গেছে, দেশটির বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গামালিয়া ন্যাশনাল সেন্টার এই যুগান্তকারী কাজটি শুরু করে দিয়েছে। তারা আশাবাদী যে আগামী দুই বছরের মধ্যে এই টিকা বাজারে চলে আসবে।
এমআরএনএ প্রযুক্তির জাদু
গামালিয়া সেন্টারের মহামারিবিদ্যা বিভাগের প্রধান ভ্লাদিমির গুশচিন রিয়া নোভোস্তিকে জানান যে, তারা অত্যাধুনিক এমআরএনএ (mRNA) প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই টিকা তৈরি করছেন। এমআরএনএ হলো মেসেঞ্জার রাইবো-নিউক্লিক অ্যাসিড। সাধারণত, প্রচলিত টিকার ক্ষেত্রে মৃত বা দুর্বল জীবাণু ব্যবহার করা হয়, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে। কিন্তু এমআরএনএ প্রযুক্তিতে কোনো জীবাণু ব্যবহার করা হয় না। এর পরিবর্তে, এটি এক ধরণের প্রোটিন তৈরি করে যা শরীরের ভেতরে গিয়ে আমাদের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বহুগুণ শক্তিশালী করে তোলে। গুশচিন বলেন, “এই টিকার মূল উপাদান হবে এক ধরনের প্রতিষেধক তরল বা অ্যান্টিজেন, যা মানবদেহে ব্যাপক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করবে।”
এইডস কী এবং কেন এটি এত বিপজ্জনক?
এইডস (AIDS) মানে অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম। এটি কোনো একক রোগ নয়, বরং রোগের উপসর্গগুলোর একটি সমষ্টি। এইডসের জন্য দায়ী হলো এইচআইভি (HIV) বা হিউম্যান ইমিউনো ভাইরাস। এই ভাইরাস যখন মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, তখন এটি শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ফলে একজন এইডস রোগী খুব সহজেই যেকোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হতে পারে। এইচআইভি সংক্রমণের শেষ পর্যায়কেই এইডস বলা হয়।
ইতিহাসে প্রথম শনাক্তকরণ
১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত করা হয়। ওই বছরই সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (CDC) এই রোগের জন্য দায়ী ভাইরাস এইচআইভি শনাক্ত করে। অনিরাপদ যৌনতা, দূষিত সিরিঞ্জের সূঁচ ব্যবহার এবং আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে গর্ভের শিশুতেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
বিশ্বজুড়ে এইডসের প্রভাব
সারা বিশ্বে, বিশেষ করে সাহারা ও নিম্ন আফ্রিকার অঞ্চলগুলোতে এইডসের প্রকোপ অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রায় ১০ লাখ মানুষ এইডসে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। তবে ভালো খবর হলো, ২০১০ সালের পর থেকে বিশ্বে এইডস রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। জাতিসংঘের হিসেব মতে, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১৩ লাখ এইডস রোগী ছিল, যা ২০১০ সালের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম।
গামালিয়া সেন্টারের সাফল্যের ইতিহাস
এর আগেও বিভিন্ন দেশ এইডসের টিকা তৈরির চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেগুলো সফল হয়নি। তাই রাশিয়ার এই উদ্যোগটি সফল হলে এটি হবে বিশ্বের প্রথম এইডস টিকা। গামালিয়া ন্যাশনাল সেন্টার এর আগে করোনার প্রথম টিকা, স্পুটনিক ভি, আবিষ্কার করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করে। স্পুটনিক ভি এর কার্যকারিতা ছিল ৯৭% এর বেশি এবং বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে এটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাই, তাদের এই নতুন প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এইডসের বিরুদ্ধে মানবজাতির লড়াইয়ে এই টিকা একটি নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিতে পারে।