বাংলাদেশের রূপকার: এক বছরে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন দিগন্তে দেশ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে যখন দেশ পথহারা ও দিগ্ভ্রান্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে হাল ধরেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল জাতির এক সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক বা বিরোধ নয়, বরং আপামর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে তিনি দেশের কর্ণধার হন। তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণকে সারা বিশ্ব স্বাগত জানিয়েছিল, যা বিশ্বের ৯২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অভিনন্দন থেকেই প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনো সরকারপ্রধান এত বিপুল আন্তর্জাতিক সমর্থন পাননি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশ ছিল এক মহা সংকটে। ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে দেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল পরনির্ভরশীল। এমন এক ক্রান্তিকালে তিনি যেন ডুবন্ত জাহাজকে উদ্ধার করার জন্য একজন সাহসী নাবিকের মতো আবির্ভূত হন। গত এক বছরে তাঁর নিরলস পরিশ্রমে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়েছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনৈতিক অভিলাষ নয়, বরং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি দায়িত্ব নেন এবং হাসিমুখে তা পালন করেন। ক্লান্তিহীনভাবে পরিশ্রম করেন এবং এর বিনিময়ে কোনো কিছু প্রত্যাশা করেন না। এই এক বছরে তিনি শুধু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারই করেননি, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার পচন রোধে কাজ করেছেন। তিনি বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গঠন করেছেন, যা রাষ্ট্র মেরামতের একটি সুনির্দিষ্ট রূপকল্প তৈরি করেছে। ড. ইউনূস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ছাড়া জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে আসার ঝুঁকি থেকে দেশকে রক্ষা করা যাবে না। এই সংস্কারগুলোই নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেছে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকার বাস্তবায়ন করবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ড. ইউনূসের প্রভাব অনস্বীকার্য। তাঁর বিশ্বব্যাপী সুনাম ও খ্যাতির কারণে বাংলাদেশের সম্মান বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর নেতৃত্বেই জাতিসংঘে বাংলাদেশ বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের অফিস বাংলাদেশে স্থাপিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে।
ড. ইউনূসের আরেকটি অনন্য গুণ হলো, তিনি ক্ষমতার প্রতি নির্মোহ। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে নির্দিষ্ট সময়ে সংস্কার ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে তিনি তাঁর প্রতিটি কথা রাখেন এবং প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় দেশে এখন উৎসবের আমেজ, যদিও কিছু মহল নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ড. ইউনূসের দৃঢ় আদর্শবাদী নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এসব বাধা অতিক্রম করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও, তারা ড. ইউনূসকে সত্যিকারের অভিভাবক হিসেবে দেখে এবং তাঁর পরামর্শ মেনে চলে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে এমন একটি নির্বাচন হবে, যা যুগ যুগ ধরে মানুষ স্মরণ রাখবে। এই নির্বাচন কেবল একটি নতুন সরকারই দেবে না, বরং জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং পরমতসহিষ্ণুতার এক নতুন বাংলাদেশের সূচনা করবে, যা হবে পরিপূর্ণভাবে ফ্যাসিবাদমুক্ত।