৯৩৫ কোটি টাকায় দুটি নতুন জাহাজ কিনছে বিএসসি, বহর বাড়াতে মহাপরিকল্পনা সরকারের
সরকারি মালিকানাধীন জাহাজ পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) তাদের বহরকে শক্তিশালী করার জন্য একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রায় ৯৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত বিএসসির জন্য এই জাহাজ দুটি কেনা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি-এর কাছ থেকে, যদিও জাহাজগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে চীনে।
এই উদ্যোগটি এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ৫৩ বছর আগে যাত্রা শুরু করা এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বহরে এক সময় ৪৪টি জাহাজ ছিল। নব্বইয়ের দশকের শেষে এর বেশিরভাগই অবসরে চলে যায় এবং জাহাজের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র দুটিতে। ২০১৮ সালে চীন থেকে কেনা ছয়টি নতুন জাহাজ যুক্ত হলে জাহাজের সংখ্যা বেড়ে আটটি হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বর্তমানে বিএসসির বহরে জাহাজের সংখ্যা কমে মাত্র পাঁচটি। এই প্রেক্ষাপটে নতুন জাহাজ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়।
স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জাহাজ ক্রয় ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত
গতকাল অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুটি জাহাজ কেনার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৯৮ হাজার ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯৩৫ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ব্যয়ে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এই দুটি জাহাজের প্রতিটির সক্ষমতা ৫৫-৬৬ হাজার ডিডব্লিউটি। দরপত্র প্রক্রিয়ায় তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও, সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি-কে বেছে নেওয়া হয়। বিএসসি নিজস্ব অর্থায়নেই এই জাহাজগুলো কিনছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তটি একটি কৌশলগত বিষয়। কারণ, জাহাজগুলো চীনে তৈরি হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের হওয়ায় এগুলো যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের বন্দরে কোনো রকম নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই চলাচল করতে পারবে। নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নিশ্চিত করেছেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই জাহাজ দুটি কেনা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, নতুন জাহাজগুলো অ্যারোডাইনামিক, ডুয়েল ফুয়েল সম্পন্ন এবং পুরোনো জাহাজের তুলনায় অধিক গতিসম্পন্ন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: ২২টি জাহাজ কেনার লক্ষ্য
বিএসসির আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ২২টি জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটির পর্ষদ। এর মধ্যে ১৫টি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া অনেকটাই এগিয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন জাহাজ কেনা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও তিনটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়াও চলমান। এর মধ্যে দুটি বাল্ক কেরিয়ার এবং একটি এমআর ট্যাংকার থাকবে। এই তিনটি জাহাজ কেনার জন্য সরকার বিএসসিকে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে।
এছাড়াও, দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে ৬টি কন্টেইনার ভেসেল কেনার জন্য প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এতে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি, চীনের কাছ থেকে আরও চারটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যার জন্য ঋণ সহায়তা মিলবে চীন থেকেই।
বিএসসির ধারাবাহিক আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির কারণে সংস্থাটির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বেড়েছে। গত এক বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিএসসির শেয়ারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন জাহাজগুলো যুক্ত হলে ভবিষ্যতে বিএসসির আয় ও মুনাফা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিশাল বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।