সাকিব আল হাসান ও আবুল খায়ের হিরুর প্রতিষ্ঠান দুদকের নজরে, ব্যাংক লেনদেন স্থগিতের সুপারিশ
পুঁজিবাজারের ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানি আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এই অভিযোগে বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং আলোচিত বিনিয়োগকারী আবুল খায়ের হিরুর মালিকানাধীন চারটি প্রতিষ্ঠানসহ মোট আটটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন স্থগিতের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর চিঠি পাঠিয়েছে বিএসইসি।
সম্প্রতি বিএসইসির একটি তদন্ত প্রতিবেদনে এই গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে। ওই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বিএসইসি দুদক চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তাকে এই চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রদান, জাল-জালিয়াতি এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে উল্লেখযোগ্য শেয়ারের মালিকানা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
যাদের ব্যাংক লেনদেন স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছে:
বিএসইসির সুপারিশ অনুযায়ী যাদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করার কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম শিকদার, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুন্সী সফি উদ্দিন, সাবেক পরিচালক মো. হুমায়ুন কবীর এবং পরিচালক (অব.) মোহাম্মদ খায়রুল বাশার।
এছাড়াও চারটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব স্থগিতের সুপারিশ করা হয়েছে:
- লাভা ইলেকট্রোডস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড: এটি মুন্সী সফি উদ্দিন ও মো. হুমায়ুন কবীরের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি আলোচিত বিনিয়োগকারী আবুল খায়ের হিরুর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান।
- মোনার্ক মার্ট লিমিটেড ও মোনার্ক এক্সপ্রেস লিমিটেড: এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রয়েছে সাকিব আল হাসানের।
- ইশাল কমিউনিকেশন লিমিটেড: এটি আমিনুল ইসলাম শিকদার ও মোহাম্মদ খায়রুল বাশারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বিএসইসির অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটির অনুরোধে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবে সপ্তমবারের মতো স্থগিতাদেশ দিয়েছে।
নেপথ্যে কী?
বিএসইসির তদন্তে উঠে এসেছে যে সাকিব আল হাসান এবং আবুল খায়ের হিরু ও তাদের সহযোগীরা মিলে আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের ৪৮.১৭৫ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছেন। এই শেয়ারগুলো কেনা হয়েছে কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ আশিক (১৮.৪০%), সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আতিকা (১৫.৯৭৫%) এবং সাবেক পরিচালক তাজাক্কা তানজিমের (১৩.৮০%) কাছ থেকে।
এর মধ্যে সাকিব আল হাসানের মোনার্ক মার্ট ২.৪০ শতাংশ এবং মোনার্ক এক্সপ্রেস ৪.৮০ শতাংশ শেয়ার কিনেছে। এছাড়া অন্যান্য সহযোগীদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম শিকদার ও মো. খায়রুল বাশার (ইশাল কমিউনিকেশনের মাধ্যমে) ১৪.৪ শতাংশ, এএফএম রফিকুজ্জামান ১০ শতাংশ, মাসুক আলম ৬ শতাংশ, মো. হুমায়ুন কবির (লাভা ইলেকট্রোডস ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমে) ২.৪০ শতাংশ এবং মুন্সী শফি উদ্দিন ৮.১৭৫ শতাংশ শেয়ার কিনেছেন।
ওটিসি থেকে এসএমই প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর প্রক্রিয়া
২০২১ সালে বিএসইসি ওটিসি মার্কেট বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে ওটিসি মার্কেটের অধীনে থাকা কোম্পানিগুলোকে তাদের আর্থিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভিত্তিতে এসএমই প্ল্যাটফর্ম বা অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে (এটিবি) স্থানান্তরিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় আল-আমিন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজকে ওটিসি থেকে এসএমই প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে কোম্পানিটির মোট ৫০ লাখ শেয়ার রয়েছে, যার মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৫০ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪৭.৪৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিএসইসির তদন্ত ও দুদকে চিঠি পাঠানোর ঘটনা পুঁজিবাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিএসইসির এই পদক্ষেপ পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাকিব আল হাসান বা তার প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।